স্বপ্নভঙ্গের লিবিয়া ফেরত সুনামগঞ্জের ২৬৫ তরুণ
রোদে পোড়া মুখ, ক্লান্ত দৃষ্টি—সবার চোখেই একটাই প্রশ্ন, “এখন কী হবে?”অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার আশায় জীবন বাজি রাখা সুনামগঞ্জের ২৬৫ তরুণ আজ ফিরে এসেছেন শূন্য হাতে। কেউ বিক্রি করেছেন ভিটেমাটি, কেউ নিয়েছেন সুদের টাকা; ১৮ থেকে ২৫ লাখ টাকা খুইয়েও তাদের ইউরোপযাত্রা শেষ হয়েছে মরুভূমির বালিতে, বন্দিশালার অন্ধকারে।
জানাগেছে, গত দুই বছরে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা—সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর থেকে শতাধিক যুবক অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের প্রত্যেককে বাংলাদেশি ও লিবিয়ান দালালচক্র প্রলোভন দেখিয়েছিল সহজে ইউরোপে পৌছে দেওয়ার।
কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই অধিকাংশ যুবক লিবিয়ার সীমান্তে মানব পাচারকারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। কেউ মাসের পর মাস বন্দিশিবিরে নির্যাতনের শিকার হন, কেউবা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের শাকিল আহমদ (২৬) এখন বাড়িতে ফিরেছেন, কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
শাকিল জানান,“২০২৩ সালের মে মাসে দালালদের মাধ্যমে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইতালি যাওয়ার চুক্তি করি। প্রথমে দুবাই, তারপর মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছাই। সেখানে আবার শরীয়তপুরের এক দালাল নতুন করে সাড়ে ৬ লাখ টাকা দাবি করে।” সব টাকা পরিশোধের পর তাকে জানানো হয়, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পাঠানো হবে। কিন্তু যাত্রার আগেই লিবিয়ার পুলিশ অভিযানে পুরো দলটিকে গ্রেপ্তার করে। শাকিল জানায়,“আমাদের ৪৮ জনকে মরুভূমিতে এক গুদামঘরে বন্দি করে রাখে। খাবার পেতাম দুই দিনে একবার, মারধর হতো প্রতিদিন। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরি,” বলেন শাকিল।
শুধু শাকিল নয়—এমন গল্প এখন শত শত পরিবারের। দোয়ারাবাজারের ফারুক মিয়া বাড়ি ফিরে দেখেছেন, জমি বিক্রির টাকাও শেষ, বাবার ঋণ শোধের উপায়ও নেই। “ইতালিতে গিয়েই টাকা ফেরত দেবো ভেবে ঋণ নিয়েছিলাম। এখন ঘরে ফিরেও মুখ দেখাতে পারি না,” বলেন তিনি। সুনামগঞ্জে ফিরে আসা এই তরুণদের বেশিরভাগের এখন কোনো আয়-রোজগার নেই। অনেকে লজ্জায় প্রকাশ্যে আসতেও ভয় পাচ্ছেন।
প্রশাসন বলছে, প্রতারণা ঠেকাতে অভিযান চলছে। জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন,“অবৈধ অভিবাসন রোধে আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছি। দালাল চক্রের বিরুদ্ধে তথ্য পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বিদেশে মানবপাচার রোধে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ তৎপরতা চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও ইউরোপে দ্রুত সচ্ছল হওয়ার স্বপ্ন তরুণদের বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। দালালচক্র এই মানসিক দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী রুবিনা আক্তার বলেন, “এই তরুণরা অপরাধী নয়, তারা পরিস্থিতির শিকার। সরকার ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব—তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়া।”
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: