রহস্যপুরুষ ফাহিম আল চৌধুরীকে নিয়ে তোলপাড় সিলেট
সিলেটবাসীর কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত নাম—ফাহিম আল চৌধুরী। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ক্রিকেটের মাঠ থেকে উঠে এসে লাইমলাইটে আসা এই চরিত্রটি এখন সিলেটের রাজনীতি, মাজার সংস্কৃতি, ধর্মীয় আলোচনা থেকে শুরু করে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছেন। সর্বত্র ব্যক্তিগত সিকিউরিটি ও প্রটোকল নিয়ে তার চলাফেরা সাধারণ মানুষের মনে জন্ম দিচ্ছে নানা প্রশ্ন। একদিকে দাতা হিসেবে প্রচার, অন্যদিকে সাহায্যপ্রার্থীদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ, আর সেই সাথে যুক্তরাজ্যে কারাদণ্ড ও নাম পরিবর্তনের মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পর নেট দুনিয়ায় তাকে নিয়ে এখন চলছে তুমুল তোলপাড়।
সিলেটের বিপিএল ক্রিকেটের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে ফাহিম আল চৌধুরী প্রথম পরিচিতি পান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি খেলাধুলার গণ্ডি পেরিয়ে সিলেটের এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে কথা বলছেন না। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মাজারের খাদেমদের কার্যক্রম, স্থানীয় রাজনীতি, এমনকি বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার ড. এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীকে নিয়েও মন্তব্য করেছেন তিনি।
মাজারের স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সিলেটে একটি কমিটি গঠন করা হলে সরাসরি তার বিরোধিতা করেন ফাহিম। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এখানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থাকবে কেন?” তার এমন সরাসরি প্রশ্নে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ কমিটির ভেতরে থাকা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। শুধু তাই নয়, ড. এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীকে উদ্দেশ্য করে জিহ্বা সংযত করার কথা বলার পাশাপাশি তাকে মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিতেও অনুরোধ জানান তিনি, যা ধর্মীয় মহলেও বেশ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ফাহিম আল চৌধুরীর বিশাল পুলিশি প্রটোকল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বহর নিয়ে চলাফেরা করাটা সিলেটে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রটোকল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিলেট মহানগর বিএনপির দপ্তর সম্পাদক তারেক আহমদ খান। তিনি নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “অনেকে এটা নিয়ে আগামী স্থানীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ সামনে আনছেন! এটি কি নিয়মিত সরকারি নিরাপত্তা, নাকি বিশেষ কোনো কারণে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা কি আসবে?”
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ফাহিম আল চৌধুরীর উত্থানকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন প্রবাসী ও সচেতন নাগরিকরা। ১৮ জুলাই ২০২৬, যুক্তরাজ্যের সেন্ট আলবান্স সিটির বাসিন্দা প্রবাসী সুলতান আহমদ ফেসবুকে লেখেন, ৫ আগস্টের আগে ‘ফা আ চৌ’ নামে কাউকে মানুষ চিনত না। বর্তমানে মোবাইল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সস্তা মোবাইল সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি ভাইরাল হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “সিলেটকে বেহেশত বানিয়ে ফেলবো... এ ধরনের নানা চটকদার কথামালা। সবই রাজনীতির ধান্ধা, ভাইরাল হওয়ার উন্মাদ নেশা।”
একই সুরে আনন্দ টিভির সিলেট প্রতিনিধি তাহির আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “জোয়ার মাঠের একজন খেলোয়াড় হঠাৎ করে সিলেটের সব বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করেছে। উদ্দেশ্য একটাই—সস্তা জনপ্রিয়তা। দুদিন পর পর উল্টোপাল্টা কথা বলবে, আর কিছু ভিউ-লোভী ইউটিউবার সেটাকে ব্রেকিং নিউজ বানিয়ে বাজারে ছাড়বে। এই সব সস্তা নাটক বন্ধ হওয়া উচিত।”
ফাহিম আল চৌধুরীর অতীত ও নাম পরিবর্তন নিয়ে সবচেয়ে বড় বোমাটি ফাটিয়েছেন সিলেট জজ কোর্টের আইনজীবী মইনুল হক বুলবুল। তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক গণমাধ্যমের সূত্র ধরে ‘হাতেমতাই মহামানবের অতীত’ শিরোনামে লেখেন- "দেশজুড়ে ধারাবাহিক প্রতারণার মাধ্যমে ২৩,০০০ পাউন্ড আত্মসাৎকারী এক প্রতারক তিন বছরের কারাদণ্ড ভোগ শুরু করেছে। পিটারবরোর ফেনগেট এলাকার ২৯ বছর বয়সী ফাহিম আল ইসহাক প্রতারণার পাঁচটি অভিযোগ এবং চুরি করা সম্পত্তি নিজের কাছে রাখার একটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন..."।
আইনজীবীর এই পোস্টের পর নেটিজেনদের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আজকের ‘ফাহিম আল চৌধুরী’র পূর্ব নাম ছিল ‘ফাহিম আল ইসহাক’।
এই নাম পরিবর্তনের পেছনের গল্প তুলে ধরে নিউজপোর্টাল ‘ক্রাইম সিলেট’ তাদের পেজে লিখেছে, একসময় মরহুম সাংবাদিক আনফর আলীর একটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন সাধারণ এক ব্ল্যাকবেরি মোবাইল হাতে থাকা ফাহিম আল ইসহাক। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ব্ল্যাকবেরি দিয়েই অনলাইন হ্যাকিংয়ের দুনিয়ায় তার পথচলা শুরু হয়। একের পর এক সফল অপারেশনের পর বন্ধুদের নিয়ে পার্টি করা ছিল তার স্বভাব। সেই ফাহিম আল ইসহাকই আজকের দিনের আলোচিত ও প্রভাবশালী ‘ফাহিম আল চৌধুরী’।
ধূম্রজাল কাটেনি
দাতা হিসেবে প্রচার পেলেও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের অভিযোগ—সাহায্যের আশায় তার কাছে গিয়ে অনেকেই খালি মুখে ফিরছেন। চটকদার ভিডিও আর প্রটোকলের আড়ালে ফাহিম আল চৌধুরীর আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে এখন সিলেটে ও ভার্চুয়াল জগতে বিতর্কের ঝড় বইছে। সাধারণ মানুষের দাবি, এই রহস্যময় প্রটোকল এবং তার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসা প্রয়োজন।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: