"ঈশ্বরের কাছে কই, আমারে এবার লইয়া যাও...’

মৌলভীবাজারে সুশন বালার আকুতি

"ঈশ্বরের কাছে কই, আমারে এবার লইয়া যাও...’

কামরান আহমদ, মৌলভীবাজার

১৯/০৭/২০২৬ ১২:৫৫:৫১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

আকাশে মেঘ জমলে যেখানে মানুষের মন নেচে ওঠে, সেখানে এক বৃদ্ধার বুকে নেমে আসে আতঙ্কের সুনামি। মেঘের ডাক শুনলেই তার দুচোখের পাতা আর এক হতে চায় না। তিনি সুশন বালা। বয়স আশির কোঠায়। মৌলভীবাজার সদর আখাইলকুড়া ইউনিয়নের শেওয়াজুরী গ্রামের এক কোণে পড়ে থাকা এক জীবন্ত উপাখ্যান। শরীরে আজ আর শক্তি নেই, পায়ে নেই চলার জোর। আছে শুধু এক জরাজীর্ণ ঘর, যা ঘরের চেয়েও বেশি এক টুকরো কষ্টের খাঁচা। আকাশের মেঘ ভাঙা বৃষ্টি যখন সেই ঘরের ফুটো টিন গলে টপটপ করে ঝরে পড়ে, তখন তা যেন একাকার হয়ে যায় সুশন বালার চোখের নোনা জলের সাথে।


"বাবারা, আমার ঘরে তো কোনো দরজা নাই। রাতে যখন বাইরে কুকুর ডাকে, বুকটা ভয়ে কেঁপে ওঠে। বৃষ্টি আইলে সারারাত জাইগা ভগবানের নাম জপি..."


কাঁপা কাঁপা গলায় কথাগুলো বলতে বলতে ছেঁড়া শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মোছেন সুশন বালা। সে জল মোছে, কিন্তু কষ্টের দাগ মোছে না।


বহু বছর আগে জীবনসঙ্গী গুরুচরণ পাড়ি জমিয়েছেন ওপারের দেশে। একমাত্র মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল; বিয়ের পর স্বামীর হাত ধরে সে চলে গেছে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে। তারপর কেটে গেছে যুগ। জন্মদাত্রী মা বেঁচে আছেন নাকি ধুলোয় মিশে গেছেন—সেই খবর নেওয়ার ফুরসত হয়নি সেই মেয়ের।


"মায়েরে একবার আইয়া দেইখা যা..."—এই আকুতিটুকু উচ্চারণ করতেই বৃদ্ধার গলা বুজে আসে কান্নায়। কিন্তু মেয়ের কাছে পৌঁছানোর মতো কোনো ফোন নেই, জানা নেই কোনো ঠিকানা। আছে শুধু বুকভরা অভিমান আর এক অনন্তহীন অপেক্ষা।


সুশন বালার ভাঙা ঘরের মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে বহু আগে। টিনের চালে শত ফুটো। বর্ষা এলে ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে আশ্রয় খোঁজেন তিনি। শোয়ার জন্য সম্বল বলতে কেবল একটা ছেঁড়া কাঁথা আর একটা চটের বস্তা। দরজা-জানালাহীন এই ঘরে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন শিয়ালের ডাক ভেসে আসে, তখন একাকীত্বের ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। এক কোণে পড়ে আছে একটা প্লাস্টিকের বদনা আর একটা ভাঙা হাঁড়ি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুশন বালা বলেন, "এই ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল দিয়েই তো আমার সংসার..."


প্রতিবেশীরা জানান, "বুড়ি মানুষটা খুব ভালো। কিন্তু চরম অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। আমরা নিজেরাও গরিব, মাঝে মাঝে একটু ভাত দিই। কিন্তু প্রতিদিন তো আর পেরে উঠি না।"


জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে সুশন বালা এখন আর কারও কাছে অঢেল টাকা চান না, চান না দামি খাবারও। তিনি শুধু চান মাথার ওপর একটু শক্ত ছাউনি, রাতে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমানোর জন্য একটা দরজা আর এক চিলতে শান্তি।


বেদনা যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন আকাশের দিকে চেয়ে তিনি বলেন, "ঈশ্বরের কাছে কই, আমারে এবার তুলিয়া লও। আর পারি না বাবা..."—এই বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন আশি বছরের এই বৃদ্ধা।


একজন মানুষ জীবনের ৮০টি বসন্ত পার করে এসে যদি শেষ বয়সে এমন এক ফুটো ঘরে, দরজা ছাড়া, সম্পূর্ণ একা ও অভুক্ত অবস্থায় কাঁদতে হয়—তবে আমাদের সভ্যতার বিবেক কোথায় মুখ লুকাবে? আমাদের মানবতাই বা কোথায়?


প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবানদের কাছে সুশন বালার নিভৃত আকুতি—একটুখানি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়ার। রাতের আঁধারে যখন আমরা নরম বিছানায় বৃষ্টির শব্দ উপভোগ করি, তখনও কোনো এক সুশন বালা ভাঙা চালের নিচে বসে একা একা ভিজে চলেন অশ্রু আর বৃষ্টির নোনা জলে।


নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad