গুচ্ছ কবিতা
দেবব্রত রায় দিপন এর কবিতা ‘পাথরের চোখ ও লাশের মিছিল’
পাথরের চোখ ও লাশের মিছিল
*
প্রতিটি ভোরে, সূর্যোদয়ের আগে
আমার স্বাধীন সোনার বাংলায় নরকের চিতা জাগে!
কখনো স্কুলে, মাদরাসায় কিংবা পথের বাঁকে—
আমার সন্তান ধর্ষিত হয়, কেউ কি মনে রাখে?
লাশের মিছিলে প্রতিদিন মরে অগণিত নিষ্পাপ,
এ কেমন দেশে জন্ম নিলাম? এ কার অভিশাপ?
যেন এ জনপদ মানুষের নয়, দানবের চারণভূমি,
আর কতকাল চোখ বুজে সব সয়ে যাবে বলো তুমি?
নেতাদের মুখে কুলুপ এঁটেছে, নীতি আজ নির্বাক,
লাশের ওপরে বসে রাজনীতি ছড়াক বিষাক্ত ঝাঁক।
মানুষের বুকে কামড় বসায় মানুষ নামের পশু,
অকারণে আজ পুড়ে ছাই হয় জনপদ আর শিশু।
মানুষ পুড়িয়ে উল্লাস করে বিকৃত উল্লাসে,
এ কেমন ঘুণে ধরেছে আজকে আমার চারিপাশে!
ওলিতে-গলিতে উপাসনালয়, ধর্মের কত বাণী!
অথচ অন্তরে এতটুকু নেই মানবতার গ্লানি।
বাণী শুধু মুখে, মগজে তো ঘুণ, হৃদয়ে স্বার্থের টান,
লোভের আগুনে প্রতিদিন পোড়ে মানুষের সম্মান।
রক্ত দেখতে দেখতে সবার চোখ গেছে আজ সয়ে,
অনুভূতিহীন পাথরের মন বেঁচে আছে শুধু ভয়ে!
কারো কোনোখানে টনক নড়ে না, সবাই তো নিশ্চুপ,
অন্যায়ের সাথে আপস করেছে সভ্যতার এই রূপ।
তবু আমি বলি—একটিবার যদি তুমি, আমি আর সে,
হাত হাত রেখে দাঁড়াই সবাই এই কালিমার দেশে;
জেগে যদি ওঠে প্রতিটি মানুষের ভেতরে থাকা সে প্রাণ,
মুহূর্তে তবে মুছে যাবে এই দানবীয় ব্যবধান!
আমি তো প্রস্তুত, অন্যায় রুখে দিতে পেতেছি বুক,
আসুন আপনিও—ছিঁড়ে ফেলি ওই ভণ্ডামির মুখোশ-মুখ।
আঁধার ফুঁড়ে যে নতুন সূর্য উঠবে আগামী ভোরে,
সেই সূর্যোদয়ে আসুক মুক্তি, মানুষ উঠুক জেরে!
ঘরের ভেতর অগণ্য মানুষ
*
আমাকে যারা এড়িয়ে চলে,
আমি সবার আগে সাড়া দিই তাদের ডাকে—
এ এক অদ্ভুত অভ্যাস,
হয়তো রক্তের ভেতরেই শেখা।
একই ঘরের বাতাসে শ্বাস নিই,
তবু কথার টেবিলে আমার জন্য
কোনো চেয়ার রাখা থাকে না।
নীরবতারাও কখনও কখনও
নামের আগে দেয় প্রশ্নচিহ্ন।
তারা যখন তুচ্ছ জ্ঞান করে,
আমি হেসে উঠি—
কারণ কান্না দেখালে
দেয়ালগুলো আরও উঁচু হয়ে যায়।
আমার শরীরের প্রতিটি কণা সক্রিয় এখনও,
হৃদয়ের ভেতর আলো নিভে যায়নি।
মন থাকলেই তো মানুষ হওয়া যায়—
এই বিশ্বাসেই দাঁড়িয়ে আছি।
অবহেলা আর অবজ্ঞাকে
পেছনের দরজা দিয়ে বিদায় দিই,
ভুলে যাই, ভুলিয়ে দিতে চাই—
যেন রক্তের সম্পর্কে
অভিমান না জন্মায় আর।
জানি, এই অভ্যাসে
আঘাত আরও গভীর হয়,
তবু প্রতিঘাত করি না—
বরং হাত বাড়িয়ে দিই আবারও,
হয়তো একদিন
কেউ সেই হাতটা ধরবে বলে।
আমি ঘরের ভেতর অদৃশ্য মানুষ,
তবু ভেঙে পড়িনি—
কারণ ভালোবাসা না পেলেও
ভালোবাসতে শেখাটাই
আমার জন্মের শিক্ষা।
মুক্তি চাই
*
মুক্তি চাই মানবতার, মুক্তি চাই যুক্তির
মুক্তি চাই অনিয়ম আর অদৃশ্য চুক্তির
মুক্তি পাক গণতন্ত্র, শেষ চাই শোষণের
মুক্তি চাই তো বিবেকের, দুর্নীতি তোষণের।
মুক্তি চাই কলমেরই, মুক্তি চাই চিন্তার
আলোকিত দেশ চাই আগামীর দিন তার।
যাক না ঘুচে বৈষম্য, দেশ হোক সকলের
অপশক্তি হারা হোক, জোর যার দখলের।
মুক্তি চাই মানুষেরই, সতেজ হোক প্রাণ রে,
নাসিকায় সুরভিত, পাই যেন ঘ্রাণ রে।
মুক্তি চাই নারীদেরও, মুক্ত হোক পাহাড়,
মুক্তি চাই সমতলে, বাঁধা হাত যাহার।
স্বাধীনতা হোক না তাই, দীনতা মুক্তির
কালো মেঘও কেটে যাবে, জয় হবে যুক্তির।
রক্তকাব্য
*
এখানে সূর্য উঠত স্বাধীনতার লালে,
এখন প্রতিদিন পাঠ হয় রক্তকাব্য।
ধূসর রঙে ঢেকে আছে আকাশ,
মেঘের ভাঁজে ভাঁজে আছে হতাশার ধ্বনি।
তেজ নেই সূর্যের,
ফুলে নেই সৌরভ,
কণ্ঠে নেই সঙ্গীত—
গলায় নেই স্বর—
কথায় নেই ছন্দ—
সুর গিলে ফেলেছে ভয় আর মৌনতার শকুন।
মানুষ এখন পরস্পরের সন্দেহে আগুন জ্বালে,
আর ধর্মের নামে পোড়ায় নিজেরই ছায়া।
লাল-সবুজের পতাকা উড়ে না বিবর্ণ আকাশে,
আকাশ আজ শকুনের অভয়ারণ্য,
জনারণ্য শ্বাপদসংকুল।
যে হাতগুলো মুক্তির গান লিখেছিল,
সেই হাতেই এখন শেকল ঝোলে।
ওরা বলে—ভালোবাসা নাকি পাপ,
মুক্ত চিন্তা নাকি বিদ্রোহ।
কিন্তু আমি জানি—
প্রতিটি ভাঙা স্বপ্নের ভেতরেই জেগে আছে
একটি নতুন স্বাধীনতার বীজ।
এসো, মুক্তচেতার মানুষরা,
তুলে ধরো সেই আগুন,
যে আগুনে পোড়ে না দেশ—
বরং আলোকিত হয় অন্ধকার।
যতদিন না ফুলে ফেরে সৌরভ,
কণ্ঠে ফেরে গান—
ততদিন আমাদের কলম, আমাদের প্রতিবাদ,
হোক এই মাটির শপথের নতুন নাম।
প্রথম সিলেট সাহিত্য ডেস্ক
মন্তব্য করুন: