জুলাই ফেরে, ফেরে না মৌলভীবাজারের মিজানুর

আইনজীবী ছেলের অপেক্ষায় মা

জুলাই ফেরে, ফেরে না মৌলভীবাজারের মিজানুর

নিজস্ব প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

১১/০৭/২০২৬ ২২:০০:৪৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

তারিখটা ছিল ২০২৩ সালের ১০ জুলাই। আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই পরিপাটি হয়ে, জামা-কাপড় গুছিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নের সুরিখাল এলাকার এক তরুণ আইনজীবী মিজানুর রহমান। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে স্বভাবসুলভ মৃদু হেসে পরিবারের সদস্যদের বলেছিলেন, "মৌলভীবাজারে এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, কাজ শেষ করেই ফিরব।"


সেদিনের সেই কণ্ঠে কোনো উদ্বেগ ছিল না, চোখে ছিল নতুন জীবনের এক আকাশ সমান স্বপ্ন। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! কে জানত, বিদায়ের সেই মৃদু হাসিটুকুই ছিল পরিবারের জন্য তার শেষ দেখা? সেই যে ঘরের চৌকাঠ পার হলেন, তারপর আর ঘরে ফেরেননি তিনি। সেদিনের সেই বের হওয়া যেন রূপ নিল এক অন্তহীন, বেদনাদায়ক আর রহস্যময় যাত্রায়।


দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আজ পূর্ণ হলো দীর্ঘ তিনটি বছর। তিন-তিনটি বছর ধরে একটি জ্যান্ত মানুষ কীভাবে পৃথিবীর বুক থেকে এভাবে কর্পূরের মতো মিলিয়ে যেতে পারে? নিখোঁজ নাকি গুম? এর পেছনে কি লুকিয়ে আছে কোনো নির্মম অপরাধ, নাকি কোনো অশুভ চক্রের হাত? —এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও কুয়াশাচ্ছন্ন, প্রশাসনের খাতায় আজও তা কেবলই এক অমীমাংসিত রহস্য।

স্বপ্নের দুয়ারে এসে এ কেমন নিয়তি?


সবচেয়ে রহস্যজনক এবং ধোঁয়াশাপূর্ণ বিষয় হলো মিজানুর রহমানের নিখোঁজ হওয়ার সময়কাল। সে সময় তার যুক্তরাজ্যে (ইউকে) যাওয়ার সব প্রস্তুতি ছিল চূড়ান্ত। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরেই দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ করার কথা ছিল তার। বিলেতের মাটিতে নতুন ক্যারিয়ার, নতুন জীবনের এক সোনালী স্বপ্ন ছিল তার চোখে। কিন্তু ঠিক যখন স্বপ্নের দুয়ারে হাত রেখেছিলেন, তখনই কোন অতল গহ্বরে হারিয়ে গেলেন মিজানুর? এটি কি স্রেফ নিখোঁজ, নাকি নিখুঁত কোনো সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার? এই রহস্যের জট তিন বছরেও খুলতে পারেনি প্রশাসন, যা সাধারণ মানুষের মনে তুলছে অজস্র প্রশ্ন।


এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম আর বুকফাটা অধ্যায়টি রচনা হচ্ছে একজন মায়ের হৃদয়ে। গত তিন বছর ধরে যার প্রতিটি দিন কাটছে জীবন্ত লাশের মতো। প্রতিটি সকাল আসে একরাশ আশা নিয়ে, আর প্রতিটি সন্ধ্যা নামে এক বুক হাহাকার আর চোখের জল নিয়ে।


বাড়ির সদর দরজায় একটু খটখট শব্দ হলেই, কিংবা কোনো অচেনা পায়ের আওয়াজ পেলেই সত্তরোর্ধ্ব এই বৃদ্ধা মা এখনো চমকে ওঠেন। বুক ধড়ফড় করে ওঠে— ‘এই বুঝি আমার মিজান ফিরে এলো!’ আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে প্রতিদিন রাতে হয়তো নিজেকেই সান্ত্বনা দেন, "আজ ফেরেনি তো কী হয়েছে, আমার ছেলে কাল ঠিক ফিরে আসবে।" সন্তানের ফেরার পথ চেয়ে চেয়ে মায়ের চোখের জল যেন আজ শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে।


ক্ষোভ ও আকুতি মেশানো কণ্ঠে এক স্থানীয় প্রতিবেশী বলেন, "একটি তরতাজা যুবক, পেশায় আইনজীবী, সে এভাবে গায়েব হয়ে গেল আর প্রশাসন ৩ বছরেও একটা সূত্র খুঁজে পেল না? আমরা জানতে চাই মিজানুর কোথায়? সে বেঁচে আছে নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে— এই সত্যটুকু জানার অধিকার কি তার মায়ের নেই?"


ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে ঘুরে আবারও ফিরে এসেছে সেই বিষাদময় জুলাই মাস। মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির শব্দে রাজনগরের সুরিখাল এলাকার সেই নিরিবিলি বাড়িটিতে এখনো কান পাতলে শুধু মায়ের চাপা কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। জুলাই ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু তিন বছরেও ফিরে আসেননি পরিবারের আশার প্রদীপ অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান।


স্বপ্নের দোরগোড়া থেকে হারিয়ে যাওয়া এই আইনজীবীর ভাগ্যে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? তিনি কি তবে কোনো অন্ধকার অধ্যায়ের বলি হলেন? এই রহস্যের শেষ কোথায়? এই প্রশ্ন এখন শুধু সুরিখাল এলাকার মানুষের নয়, বরং বিবেকবান প্রতিটি মানুষের। প্রশাসনের কাছে পরিবারের একটাই আকুতি—সত্যটা অন্তত সামনে আসুক।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad