ফজলে রাব্বি এর গুচ্ছ কবিতা ‘এখানে জলসিঁড়ি বাতাসের স্রোতে’

ফজলে রাব্বি এর গুচ্ছ কবিতা ‘এখানে জলসিঁড়ি বাতাসের স্রোতে’

প্রথম ডেস্ক

১০/০৭/২০২৬ ০০:৪৮:৪৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বিচ্ছিন্ন

*

প্রতিদিন হাঁটি,

হেঁটে হেঁটে চলে যাই নিজের থেকে দূরে

মাঝে মাঝে রাতে অবসরে

স্বপনে কিংবা অচেতন-সচেতন ঘোরে

ফিরতে ইচ্ছে হয় নিজের কাছে, কবিতার কাছে। 

টই টই করে ঘুরা ছন্নছাড়া জীবনের কাছে।

পরদিন আবারও দৈনন্দিন তাগাদায় আরেকটু দূরে যাই,

ফেরার পথটুকু করে ফেলি আরও বেশি দীর্ঘ।

ক্ষুধার কুচকাওয়াজে ছন্দবদ্ধ হেঁটে যে পথ

অতিক্রম করে ফেলেছি সে পথে ফিরতে পারবো না জানি,

তবুও মাঝে মাঝে অবকাশ এলে পরিভ্রমণ করি।


ক্ষুধা,

তোমার এত ক্ষমতা! 

তোমারে পূজিতে বিসর্জন দিতে হয় নিজেকে।


মজদুর

*

পুড়ছে শ্রমিক, তারা কি মানুষ? 

তারা তো সংখ্যা। যেমন সংখ্যা হয়

মেশিনের মুখ থেকে 

অবিরত বমি হতে থাকা পণ্য।


পুড়ছে শ্রমিক, তারা কি মানুষ?

তারা তো ইট যারা প্রতিনিয়ত পুড়েছিল 

দরিদ্রতার অনলে।


পুড়ছে শ্রমিক, তারা কি মানুষ? 

শালারা গরীব। ওরা খায় কম, কিনেও কম

ওদের জন্যই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর জমে কম।


পুড়ছে শ্রমিক, তারা কি মানুষ? 

ওরা উগ্র, ওরা উশৃঙ্খল

দুই টাকার মজুরি আদায়ের জন্য 

ওরা রাস্তা অবরোধ করে।


ওরা চিরকাল পুড়ছে, পুড়তে থাকুক 

হে রাষ্ট্র! এসো

তালাবদ্ধ করে পোড়াও ওদের। 

এবং পরকালে আল্লাহ্ও ওদের পোড়াবে 

কেননা ওরা মজুর, ওরা গরীব 

ওরা শুধু কাজ করে, নামাজ পড়েনা।


শ্রমিকের রক্ত ও শ্রম উভয়ের মূল্যই কম

*

সূর্য ওঠার আগেই জেগে ওঠি যারা

কাজের নামে শুরু করি দিন ঘাম ঝরানোর,

কম টাকায় শ্রম বেচে ফলাই সোনার ফসল। 


আমরা তারাই যারা প্রতিদিন কারখানায়

নিজেদের চালিয়ে দেই মেশিনের তলে,

যাদের বিরামহীন প্যাডেলে ঘুরে

অর্থনীতির চাকা কিন্তু সেই চাকায় চড়ে—

নিজেরা যেতে পারি না স্বাভাবিক মৃত্যুর দেশে।


পুঁজিবাদের গোলামী করি তাই

আমাদের আর কোনো পুঁজি নাই

শুধু আছে কাস্তে ও হাতুড়ি ধরে রাখা পবিত্র হাত,

যে হাত গড়ে তোলে সভ্যতা—

আবার সে হাতই বাঁচার আকুতি নিয়ে

ইশারা দিতে থাকে আগুন দগ্ধ কারখানা থেকে।


পৃথিবীর বিলাসিতার উপাদান উৎপাদনে

আমাদের গোয়া দিয়ে বেরিয়ে যায় দম 

তবুও— শ্রমিকের রক্ত ও শ্রম 

উভয়ের মূল্যই কম।


ছাতিরচর

*

এখানে জলসিঁড়ি বাতাসের স্রোতে

স্থির হয়ে আছে চিল

কখনও জড়তায় ডানা ঝাপটায়

আবার করচের ডালে গিয়ে চুপ

সূর্যের ক্রোধে, নিভৃতে—

দেখে যায় পানকৌড়ির ডুব।


সারি সারি বিদ্যুতের পিলার 

পার হয়ে চলে যায় ইঞ্জিনের নৌকা,

নীলাচলের নিচে জাগ্রত ডুবুরি ঘোড়াউত্রা;

ডিঙা বাঁধা ঘাটে সারে হাওর কন্যার স্নান

ভাটিয়ালির সুরে মাঝি বেয়ে যায় উজান।


পাটাতনে বসে বসে এক রমনী

চুল দুলিয়ে ঢেউ খেলিয়ে ঢেকে ফেলে 

সূর্যের সোনালী আভা

এমন মাতাল দৃশ্যে যেন হৃদয়ে উঠে ঝড়

মৃদু তমসায় ছড়িয়ে শোভা—

বুকে তাহার জাগিয়ে রেখেছে ছাতিরচর


ভুল পথ

*

হঠাৎ থমকে যাওয়া অবেলায়

দৃষ্টি ফেলে রাখি অপেক্ষায়

জানি শীতকাল চলে গেলেই 

কুয়াশা থেকে আলাদা হয়ে যাবে ধূলো।


শুধু পড়ে থাকবো আমি অপচয় সাধনায়

নির্মিত ছাঁদ খোলা এই স্যাঁতস্যাঁতে চিলেকোঠায়।


স্বপ্নযুগের সেই মিঠে রোদ

প্রতিবেশীর লন্ঠনের মৃদু আলো

এসব এসে পড়বার কথা থাকলেও—

আসে—বৃষ্টির ফোঁটা, শীতের বাতাস ও পাখির বিষ্ঠা।


চুলের গোড়ায় জমে থাকা সিমেন্ট ডাস্ট,

হাতে-পায়ের জয়েন্টে জং

এবং হৃদয়ে উৎপাদিত বিরহের বুদবুদ নিয়ে

আমি কেবল বুলাতে পারি হাত

বইয়ের স্তুপে দলবদ্ধ ধূলোর আস্তরণে।


এমনই গন্তব্য হায়!

যেখানে কেবলমাত্র পথভ্রষ্ট পথিকদের

পদচিহ্ন অনুসরণ করেই আসা যায়

ফেরার সব রাস্তা বন্ধ হওয়ার পর

উদিত বোধোদয় বলে—

আমি আসলে ভুল রাস্তায় এসেছি।

আর আর

মন্তব্য করুন: