যাদুকাটার ‘অঘোষিত সম্রাট’ সাংবাদিক হাবিব সারোয়ার আজাদ (পর্ব-২)
তাহিরপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যাদুকাটা নদী। এই নদীর ওপর নির্ভর করেই চলে উপজেলার লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। নদীটি সুনামগঞ্জ জেলার দুটি উপজেলায় বিস্তৃত হলেও বালুমহাল হিসেবে তাহিরপুরের পরিচিতিই বেশি। ইজারার সুবিধার্থে সরকার যাদুকাটা নদীর বালুমহালকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছে। এর একটি অংশকে ‘যাদুকাটা-১’ এবং অপর অংশকে ‘যাদুকাটা-২’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুটি ভাগে ইজারাদার হিসেবে দায়িত্বে রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান। ‘যাদুকাটা-১’ এর দায়িত্বে রয়েছে মেসার্স তাহিয়া স্টোন এবং ‘যাদুকাটা-২’ বালুমহালের ইজারাদার মেসার্স জিনান এন্টারপ্রাইজ।
ইজারার শর্ত অনুযায়ী, নদীতে সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করতে হবে এবং সরকার নির্ধারিত রেট অনুযায়ী ইজারাদাররা প্রতি ঘনফুট বালুর রয়্যালটি আদায় করবেন। তবে যাদুকাটা নদীতে এই দুটি শর্তের কোনোটিই মানা হচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাড়তি টাকা উপার্জনের লক্ষ্যে ইজারাদারদের নির্দেশেই যাদুকাটার বুকে চলছে শত শত অবৈধ ড্রেজার ও ‘শেইভ মেশিন’ (সেভ মেশিন)। সরকার নদীতে বৈধভাবে কাজ পরিচালনার জন্য ইজারা দিয়েছে, যাতে শ্রমিক-মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। কিন্তু অবৈধভাবে শেইভ ও ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে নদীর পাড় কেটে স্থানীয় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও পুলিশ মিলে নদী ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় মেতেছেন। বিনিময়ে এক অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঢুকছে স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে।
যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধ ড্রেজার বন্ধের দাবিতে মাঝে-মধ্যে স্থানীয় পরিবেশবাদীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ নিয়ে বিভাগীয় শহরে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খোদ পরিবেশবাদীদের আত্মীয়-স্বজনরাই ড্রেজার ও শেইভ মেশিন দিয়ে প্রতিদিন যাদুকাটার তীর কেটে চলেছেন। একসময় নদীর দুই পাড়ে বৃক্ষরাজিসহ ঘরবাড়ি থাকলেও অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে অনেক আগেই তা বিলীন হয়ে গেছে। এমনই এক কথিত পরিবেশবাদী ও সাংবাদিক হলেন হাবিব সারোয়ার আজাদ। ‘প্রথম সিলেট’ পত্রিকায় তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশের পর, হাবিব সারোয়ারকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি পরিবেশকর্মী দাবি করে সাফাই গান তাঁর এক সহকর্মী সাংবাদিক। তিনি ‘প্রথম সিলেট’ এর প্রতিবেদককে জানান, “হাবিব সারোয়ার যাদুকাটা নদীকে ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষার জন্য বারবার আন্দোলন করেছেন।” তবে পরিবেশবাদী হয়েও হাবিব সারোয়ারের দুটি ড্রেজার মেশিন কীভাবে প্রতিদিন নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে—প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের কোনো জবাব ছিল না ওই সংবাদকর্মীর কাছে।
স্থানীয়রা জানান, যাদুকাটার ওপর নির্মাণাধীন ‘শাহ আরফিন ও অদ্বৈত মৈত্রী সেতু’র কাজ ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাজনৈতিক জটিলতা ও ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে বাকি কাজটুকু দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। এরই মধ্যে সেতুর ৫টি গার্ড ভেঙে পড়েছে। এই গার্ড ভাঙার পেছনে স্থানীয়রা সাংবাদিক আজাদের ছেলে শিপু পরিচালিত ড্রেজার মেশিনকে দায়ী করেছেন। পরিবেশকর্মী দাবিদার ওই সাংবাদিকের ব্যাপারে স্থানীয় আবুল হোসেন জানান, একদিকে ছেলের ড্রেজার তাণ্ডব, অন্যদিকে নদী থেকে সাংবাদিক আজাদের পক্ষে প্রতিদিন অবৈধ চাঁদা আদায়—যাদুকাটা নদীতে এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, প্রতিদিন যাদুকাটা নদীতে ২০০ থেকে ২৫০টি শেইভ মেশিন চলে। প্রতিটি মেশিন দৈনিক ২ থেকে ৩ হাজার ঘনফুট বালু কাটে। সেই হিসাবে, ২৫০টি শেইভ মেশিন দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করে। প্রতি ঘনফুটে ইজারাদারের রয়্যালটি ২০ টাকা ধরে দৈনিক আদায় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এর পাশাপাশি নদীতে আরও ২০ থেকে ৩০টি ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে। প্রতিটি ড্রেজার মেশিন প্রায় ৪ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করে। এভাবে ৩০টি ড্রেজার মেশিন দৈনিক নদীর তীর কেটে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ঘনফুট বালু তোলে। প্রতিদিন যাদুকাটার বুকে মেশিন লাগিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর দিনশেষে প্রতি ঘনফুট হিসেবে টাকা তোলা হয়। এই টাকার ভাগ পায় থানা-পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও সংবাদকর্মীরা। তবে সবার পক্ষে এই চাঁদাবাজির প্রতিনিধিত্ব করেন হাবিব সারোয়ার আজাদের মনোনীত দুই ব্যক্তি—আলিম উদ্দিন ও কিরণ রায়। দিনশেষে তোলা এই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা।
স্থানীযদের ভাষায়, এই সবকিছুই চলে হাবিব সারোয়ারের নিয়ন্ত্রণে। ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শেইভ মেশিনের মালিক জানান, হাবিব সারোয়ার আজাদ যাদুকাটা নদীর ‘ডন’। তাঁর কথামতোই নদীতে শেইভ ও ড্রেজার মেশিন চালানো বা বন্ধ করা হয়। আজাদ বললেই নদীর পাড় কাটা শুরু হয়, আবার তাঁর ইশারাতেই বন্ধ হয়। নদীর পাড় কাটার সুবিধার জন্য ব্যবসায়ীরা প্রতি রাতে শেইভ মেশিন প্রতি ২০০০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে থাকেন।
সাংবাদিক হাবিব সারোয়ারের নামে যাদুকাটা নদী থেকে চাঁদা উত্তোলনে মনোনীত আলিম উদ্দিনের কাছে অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করলেও পড়ে তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ভাই আমি নিরীহ মানুষ। আমারে ইতার মাঝে জড়াইয়া বিপদে ফেলবেন না। আমি এ বিষয়ে কিচ্ছু কইতাম পারতাম না। ভিডিওতে আপনি হাবিব সারোয়ারের পক্ষে টাকা গুনে গুনে আদায় করছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ইতা আগে উডাইতাম। এখন তো দু-এক মাস ধরে আমি গাঙ (নদী) এ যাই না।
সকল অভিযোগে বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিক হাবিব সারোয়ার আজাদ বলেন, ‘যারা বলছে আমার পক্ষে টাকা আদায় করেছে,তারা মিথ্যা বলছে। অথবা তারা কোন একটি পক্ষের হয়ে আমার নাম প্রচার করে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে মানহানির চেস্টা করছে।এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি এলাকায় যাই না’। কেন এলাকায় যান না এবং এলাকায় না থেকে কীভাবে সাংবাদিকতা করেন -প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তাহিরপুরে সদ্য যোগ দেওয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ জানান, ‘আমি আসার আগে যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধ বাল উত্তোলনসহ চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগ শোনেছি। কিন্তু বাস্তবে এখন আর সেই চিত্র নেই। যাদুকাটা নদীতে এখন আর বালু উত্তোলন হয় না। সুতরাং চাঁদাবাজির বিষয়টি ঠিক নয়।
(নোট: ভিডিও কল রেকর্ডসহ বিস্তারিত আরও তথ্য প্রকাশ হচ্ছে ৩য় পর্বে।)
তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: