যাদুকাটার ‘অঘোষিত সম্রাট’ সাংবাদিক হাবিব সারোয়ার আজাদ
পরিবেশ, প্রকৃতি কিংবা নদীর নাব্য-কোনো কিছুরই তোয়াক্কা নেই তাঁর। তিনি চাইলেই যাদুকাটার বুকে চলে দানবীয় ড্রেজার মেশিন, তাঁর ইশারাতেই নির্ধারিত হয় দৈনিক চাঁদার হার। যাদুকাটার অঘোষিত সম্রাট খ্যাত সেই ভয়ঙ্কর লোকটির নাম হাবিব সারোয়ার আজাদ। তিনি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার তাহিরপুর উপজেলা প্রতিনিধি। স্থানীয়দের কাছে তিনি বহুদিন আগ থেকেই এক আতঙ্কের নাম। বিস্তীর্ণ যাদুকাটা নদীকে রীতিমতো নিজের ব্যক্তিগত ‘টাকার মেশিন’ বানিয়ে একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এই সাংবাদিক। এমনকি স্থানীয় তাহিরপুর থানা পুলিশও তাঁর এই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেটের কাছে কার্যত জিম্মি বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন এবং লাগামহীন চাঁদাবাজির মাধ্যমে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন আজাদ। বিগত ৬ বছর ধরে এলাকাছাড়া হয়েও সিলেট শহরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে রিমোট কন্ট্রোলে নিয়ন্ত্রণ করছেন যাদুকাটার পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড। অবশেষে তাঁর এই সাম্রাজ্যে বড় ধাক্কা লেগেছে। গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার বসুন্ধরা শপিং মল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁর ছেলে ও এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সহযোগী শিহাব সারোয়ার শিপুকে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর সীমান্তে খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত যাদুকাটা নদীটি বাংলাদেশের অন্যতম রূপসী নদী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কতিপয় বালুখেকো সিন্ডিকেটের লোভের গ্রাসে আজ এই নদীর যৌবন ও সৌন্দর্য বিলুপ্তপ্রায়।
সরেজমিনে (২০ জুন) যাদুকাটা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়ঙ্কর চিত্র। নদীজুড়ে চলছে বালু কাটার মহোৎসব। প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে আড়াইশ শেইভ-মেশিন এবং ২৫ থেকে ৩০টি ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদীর তীর কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। এই যন্ত্রদানবদের অবিরাম তাণ্ডবের কারণে নদী তীরবর্তী প্রায় ২৭টি গ্রামের মানুষ চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন। অনেকেই হারিয়েছেন নিজেদের ভিটেমাটি। শত শত বাল্কহেড দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিন-রাত এই অবৈধ বালু পাচার হচ্ছে। আর এই পুরো ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে মূল খলনায়কের ভূমিকায় রয়েছেন সাংবাদিক হাবিব সারোয়ার আজাদ।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হাবিব সারোয়ার আজাদের প্রতাপ এতটাই ভয়ঙ্কর যে, এলাকায় একটা কথা প্রচলিত,'আজাদের কথায় যাদুকাটায় বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়।' স্থানীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে থানা পুলিশ, সবার অলিখিত ভাগের টাকা নিয়ন্ত্রণ করেন এই একজনই।
আজাদের এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয় জনতা দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক উদ্দিনের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁর ওপর চড়াও হলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। সেই গণরোষের পর গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন আজাদ। বর্তমানে তিনি সিলেট শহরে বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন সমানতালে। শুধু তাহিরপুর নয়, সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, ছাতক ও দোয়ারাবাজার এলাকাতেও পত্রিকার ভয় দেখিয়ে ‘ফরমায়েশি সংবাদ’ প্রকাশের মাধ্যমে অবৈধ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এলাকায় না থাকলেও মাঠ পর্যায়ে আজাদের হয়ে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য দেখভাল করে তাঁর দুই বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। এর একজন হলেন ঘাগটিয়া গ্রামের আলিম উদ্দিন (৫০) এবং অপরজন গড়কাটি গ্রামের কিরণ রায় (৪০)। গেল মাসের ১০ জুন প্রথম সিলেটের ইমেইল এ্যাড্রেসে একটি ভিডিও ফোটেজ আসে। সেই ভিডিওতে হাবিব সারোয়ারের হয়ে টাকা উত্তোলনের দৃশ্য রয়েছে। একইসাথে তৃতীয় এক ব্যক্তি প্রশ্নের জবাবে চাঁদার টাকা গ্রহণকারী আলিম উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়-'’টাকা তো আজাদ চাচার পক্ষে আমরা তুলছি।' তৃতীয় ব্যক্তির আবার প্রশ্ন-থানা পুলিশ টাকা নিছে নি? জাবাবে আলিম উদ্দিন জানান-না না । টেকা ক্যামনে কিলাখান বাট অইবো ইতা হি বেডায় (সাংবাদিক আজাদ) বুঝবো। আমরা তান কাছে টেকা দেই'। তবে প্রশ্নকর্তা তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় নি।
নদী থেকে সংগৃহীত এই অবৈধ উপার্জনের টাকা প্রতিদিন বাদাঘাট কার্যালয়ে জমা হতো আজাদের ছেলে শিহাব সারোয়ার শিপুর কাছে। বাবার এই ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্যের প্রধান লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করতো ২১ বছর বয়সী এই তরুণ।
হাবিব সারোয়ার আজাদ বাদাঘাট কামড়াবন্দ গ্রামের মৃত বদ মিয়ার ছেলে। একসময় সাধারণ জীবনযাপন করলেও সাংবাদিকতার আড়ালে চোরাচালান ও চাঁদাবাজি তাঁকে উপজেলার অন্যতম শীর্ষ ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। শুধু নদীখেকোই নন, তিনি একজন চিহ্নিত চোরাকারবারিও। ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ কর্তৃক একটি বড় ভারতীয় পেঁয়াজের চালান জব্দের ঘটনায় অন্যতম আসামি এই হাবিব সারোয়ার আজাদ।
বাবার মতোই ভয়ঙ্কর অপরাধের রেকর্ড রয়েছে ছেলে শিপুর। ২০২০ সালে বিজিবির হাতে অস্ত্র ও চোরাই মোটরসাইকেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল শিপু। একাধিক চোরাচালান ও অস্ত্র মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও এতদিন সে পুলিশের চোখের সামনেই যাদুকাটা নদীতে অবৈধ ড্রেজার ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। কিন্তু আজাদের প্রভাবে থানা পুলিশ ছেলেকে গ্রেপ্তার করে নি। অবশেষে ঢাকার বসুন্ধরা শপিং মল থেকে শিপুর গ্রেপ্তারের পর যাদুকাটা তীরবর্তী মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, মূল হোতা হাবিব সারোয়ার আজাদ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় কাটেনি আতঙ্ক। স্থানীয়দের দাবি, এই পরিবেশখেকো ও চাঁদাবাজ সাংবাদিককে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে যাদুকাটা নদীকে রক্ষা করা হোক।
সাংবাদিক হাবিব সারোয়ারের নামে যাদুকাটা নদী থেকে চাঁদা উত্তোলনে মনোনীত আলিম উদ্দিন অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথম সিলেটকে জানান, ভাই আমি নিরীহ মানুষ। আমারে ইতার মাঝে জড়াইয়া বিপদে ফেলবেন না। আমি এ বিষয়ে কিচ্ছু কইতাম পারতাম না। ভিডিওতে আপনি হাবিব সারোয়ারের পক্ষে টাকা গুনে গুনে আদায় করছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ইতা আগে উডাইতাম। এখন তো দু-এক মাস ধরে আমি গাঙ (নদী) এ যাই না।
সকল অভিযোগে বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিক হাবিব সারোয়ার আজাদ বলেন, ‘যারা বলছে আমার পক্ষে টাকা আদায় করেছে,তারা মিথ্যা বলছে। অথবা তারা কোন একটি পক্ষের হয়ে আমার নাম প্রচার করে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে মানহানির চেস্টা করছে।এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি এলাকায় যাই না’। কেন এলাকায় যান না এবং এলাকায় না থেকে কীভাবে সাংবাদিকতা করেন -প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
তাহিরপুরে সদ্য যোগ দেওয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ জানান, ‘আমি আসার আগে যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধ বাল উত্তোলনসহ চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগ শোনেছি। কিন্তু বাস্তবে এখন আর সেই চিত্র নেই। যাদুকাটা নদীতে এখন আর বালু উত্তোলন হয় না। সুতরাং চাঁদাবাজির বিষয়টি ঠিক নয়।
তানজুমা তাবাসসুম
মন্তব্য করুন: