সুনামগঞ্জে নৌঘাটে চাঁদাবাজি ও নির্যাতন: ইজারাদারের বিরুদ্ধে এসপি-কে স্মারকলিপি
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার যাদুকাটা নদীসহ বিভিন্ন নৌঘাটে সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে ইজারাদারের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে ৩ থেকে ৪ গুণ অতিরিক্ত টোল আদায় এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা এবং প্রতিবাদ করলেই সাধারণ নৌ-শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও মিল বন্ধের হুমকির প্রতিবাদে এবার মাঠে নেমেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও জনপ্রতিনিধিরা।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে এই ‘টোল সন্ত্রাস’ ও শ্রমিক নির্যাতন বন্ধের দাবিতে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছে ভুক্তভোগীদের একটি সমন্বিত প্রতিনিধি দল।
স্মারকলিপিতে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, তাহিরপুর উপজেলার পাঠলাই নদীর কামালপুর ঘাট, যাদুকাটা নদী, চারাগাঁও, বাদাঘাট এবং জামালগঞ্জের দুর্লভপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই চলছে এই চাঁদাবাজি। সরকারি চার্ট অনুযায়ী যে টোল নেওয়ার কথা, ইজারাদার ও তাদের নিযুক্ত লাঠিয়াল বাহিনী তার চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি টাকা আদায় করছে। বৈধ টোল দিতে চাইলে তা গ্রহণ না করে উল্টো নৌযান আটকে রাখা হচ্ছে। ফলে নদীপথে পাথর ও বালু পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের অভিযোগ, এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই নেমে আসে নির্যাতন। ভুক্তভোগী শ্রমিকদের মারধর, নৌযান জব্ধ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ক্রাশার মিল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। ইজারাদার পক্ষের এই সন্ত্রাসী আচরণের কারণে অনেকেই চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন, যার ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের রুটি-রুজি এখন হুমকির মুখে।
বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাখাব উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই টোল সন্ত্রাসের কারণে পুরো এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানমালের নিরাপত্তা হারিয়েছেন। প্রশাসন অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।
যাদুকাটা স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে এখানে বৈধভাবে ব্যবসা করছি। কিন্তু বর্তমানে ঘাটে ঘাটে ইজারাদারের লোকজন ডাকাতদের মতো আচরণ করছে। অতিরিক্ত টোলের কারণে পাথরের দাম বেড়ে যাচ্ছে, নির্মাণকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং আমরা ব্যবসায়ীরা বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ছি। আমরা অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি জানাই।
একই সুরে যাদুকাটা বালু শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুশ শাহিদ বলেন, আমরা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে চাই না, বৈধ টোল দিতে আমরা প্রস্তুত। কিন্তু ইজারাদারের নামে এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও শ্রমিক নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ইজারাদার নাসির উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, আমরা সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে সরকার নির্ধারিত হারেই টোল আদায় করছি। চলতি অর্থবছরে প্রতি টনে সরকারি টোল ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আমরা সেই হারেই টাকা নিচ্ছি। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
স্মারকলিপি গ্রহণ শেষে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার প্রতিনিধি দলকে আশ্বস্ত করে জানান, নৌপথে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে। নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইজারাদারের সাথে বসা হবে এবং গত বছরের তুলনায় টোল বৃদ্ধির হার ও বর্তমান চার্ট খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যাদুকাটা ও পাঠলাই নদীর এই নৌঘাটগুলো সুনামগঞ্জের অর্থনৈতিক ফুসফুস। অবিলম্বে এই অতিরিক্ত টোল আদায় ও শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ করা না গেলে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পাথর ও বালুভিত্তিক শিল্প গভীর সংকটে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে দেশজুড়ে চলমান বিভিন্ন উন্নয়নকাজে।
প্রীতম দাস/ সজল আহমেদ
মন্তব্য করুন: