‘আফাল’ আতঙ্কে হাওরাঞ্চল!

স্থায়ী প্রতিরক্ষা দেয়ালের দাবি

‘আফাল’ আতঙ্কে হাওরাঞ্চল!

লতিফুর রহমান রাজু. সুনামগঞ্জ

০৯/০৭/২০২৬ ২১:১৫:৩৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বর্ষা এলেই হাওরাঞ্চলে শুরু হয় এক নতুন জীবনযুদ্ধ। পানির সাথে লড়াই করেই বেঁচে থাকতে হয় সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার খেটে খাওয়া মানুষদের। প্রতি বছর বর্ষায় হাওরে পানি বাড়ে, গ্রামগুলোতে পানি ঢোকে— এই চিরচেনা রূপের সাথে হাওরবাসী অভ্যস্ত। কিন্তু পাহাড়ি ঢলে পানি যখন হঠাৎ বাড়তে বাড়তে বন্যা হয়ে ওঠে, তখন দুর্ভোগ নেমে আসে কয়েকগুণ। আর সেই সাথে যোগ হয় তীব্র ‘আফাল’ আতঙ্ক। দমকা বাতাসের সাথে হাওরে সৃষ্ট দানবীয় ও রাক্ষুসে বড় বড় ঢেউকেই স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘আফাল’।


এই আফালের আগ্রাসী থাবায় এখন দিশেহারা হাওরপাড়ের মানুষ। রাক্ষুসে ঢেউয়ের কবল থেকে মাথাগোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু টিকিয়ে রাখতে দিন-রাত চলছে প্রাণান্তকর সংগ্রাম। তবুও থামানো যাচ্ছে না বসতভিটার ভাঙন। ঢেউয়ের হাত থেকে ঘরবাড়ি বাঁচাতে নির্ঘুম রাত কাটছে নারী-পুরুষ ও শিশুদের।


সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর, বিশ্বম্ভরপুর, দিরাই, শাল্লা ও জগন্নাথপুর উপজেলার হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে এখন কেবলই কান্নার রোল। মানুষের চোখের সামনেই ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে বিলীন হয়ে যাচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি।


মধ্যনগর উপজেলার রংচী, ঢুলপুষি, শাইল্লানি, রাঙ্গামাটি, আটাইশা মাছিমপুর, পলমাটি, সাজদাপুর, কাহালা, কামারগাঁও, দুগনই, আমজোড়া ও জলুসা গ্রামের মানুষ এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। রংচী গ্রামের বাসিন্দা মুহাম্মদ আলী জানান, "দিনের বেলা ঢেউয়ের উপদ্রব কিছুটা কম থাকলেও রাতে এর রূপ হয় ভয়াবহ। ঢেউয়ের আঘাতে ঘরবাড়ি ভেঙে বহু মানুষ পথে বসার উপক্রম হয়েছে।"


পলমাটি গ্রামের গিয়াস উদ্দিন জানান, "বাঁশ আর কচুরিপানা দিয়ে ঘরের চারপাশে কোনো রকমে ‘আড়ি’ (বাঁধ) দিয়ে বসতভিটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। হাওরপাড়ের প্রতিটি গ্রামে যদি স্থায়ী সরকারি প্রতিরক্ষা দেয়াল (ওয়েভ প্রটেকশন ওয়াল) নির্মাণ করা হতো, তবে আমাদের এই স্থায়ী দুঃখ লাঘব হতো।"


এদিকে শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর, কালিয়াকোটা, ভান্ডারবিল ও বরাম হাওর এলাকার চিত্র আরও ভয়াবহ। আফালের থাবায় ইতিমধ্যে উপজেলার শতাধিক বাড়িঘর বিলীনের পথে। সর্বস্ব হারানোর দুশ্চিন্তায় স্তব্ধ হয়ে গেছেন দুর্গতরা। তবুও জন্মভিটার মায়ায় ঘরবাড়ি ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চাচ্ছেন না অনেকেই।


মামুদনগর গ্রামের শহীদ মিয়া জানান, সপ্তাহখানেক আগে উত্তাল হাওরের ঢেউ তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। এখন দিন-রাত কাটে আতঙ্কে। মুক্তারপুর গ্রামের পংকজ দাস জানান, ১১ জনের বড় পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মাত্র একজন। এখন এলাকায় কাজ নেই, ঘরে চালও নেই। এর মধ্যে আফালের চাদরে বসতভিটাটুকুও বিলীন হওয়ার পথে।


একই গ্রামের সুজন দাস বলেন, "কচুরিপানা আর গাছের ডাল দিয়ে ঢেউ ঠেকানোর চেষ্টা করছি। বানের পানি শরীরে লাগলে চুলকায়, তার ওপর আছে সাপ ও জোঁকের ভয়। ঘর ছেড়ে চলে গেলে ঢেউ ঠেকাতে কচুরিপানা দেওয়ার কেউ থাকবে না, সেই সুযোগে আফাল পুরো বাড়ি নিশ্চিহ্ন করে দেবে। তাই ভিটের মায়ায় বুক বেঁধে পড়ে আছি।" নাইন্দ্যা গ্রামের প্রবোধ দাস আক্ষেপ করে বলেন, "আফালের ভয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বিশাল ঢেউ ঘরের বেড়া আর ভিটার মাটি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কোনোভাবেই রক্ষা মিলছে না।"


হবিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস বলেন, "বর্ষায় হাওরবাসীর প্রধান শত্রু এই ‘আফাল’। প্রতি বছর ঢেউয়ের কারণে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। সরকারিভাবে যদি হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা হয়, তবেই মানুষ রক্ষা পাবে।"


এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস জানান, "বর্ষার এই সময়টা হাওরপাড়ের মানুষের জন্য সত্যিই বিপজ্জনক। পানি বাড়ার কারণে হাওরে বড় বড় ঢেউয়ের সৃষ্টি হচ্ছে, যা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে এলজিইডি (LGEDI) প্রকৌশলীর সাথে কথা বলব। আগামী মৌসুমে ভাঙন প্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।"


সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য জানতে মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় ঘোষের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।


প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের সামনে দাঁড়িয়ে সুনামগঞ্জের হাওরবাসী এখন কেবলই প্রকৃতির শান্ত হওয়ার এবং প্রশাসনের দ্রুত টেকসই পদক্ষেপের অপেক্ষা করছেন।

ডিডি / অথৈই

মন্তব্য করুন: