ক্ষণস্থায়ী ও নগণ্য আমরা

ক্ষণস্থায়ী ও নগণ্য আমরা

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন

১২/০৭/২০২৬ ০২:১১:২৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ধরা যাক, বিশাল আয়তনের প্রশান্ত মহাসাগর। উপর থেকে কেউ একজন এর জলে একটি মার্বেল নিক্ষেপ করল। মার্বেল, মানে ছোটবেলায় আমরা বাড়ির উঠানে কিংবা মেঠোরাস্তার উপর কাঁচের তৈরি গোলাকৃতির যেসব স্বচ্ছগোলকদ্বারা 'মার্বেলখেলা' খেলেছি সেটার কথা বলছি। জল তরল পদার্থ। মার্বেলটি জলের যে বিন্দুতে পতিত হলো সেই বিন্দুকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকার তরঙ্গের সৃষ্ট হলো। ঢেউয়ের পরিধি বৃদ্ধি পেয়ে কিছুক্ষণ এগিয়ে চলল। অতঃপর এর তীব্রতা হ্রাস পেয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্রজলে হারিয়ে গেল। কেন্দ্র হতে সৃষ্ট তরঙ্গ বড়জোর অর্ধমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে নিঃশেষ হলো। আর মার্বেলটি আস্তে আস্তে সমুদ্র জলে তলিয়ে গিয়ে নিচে মাটিতে পড়ল। মার্বেল নিরেট বস্তু। সহসা মাটির সাথে মিশবে না। তবে বহুদিন পর মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে যাবে। কারণ মাটি প্রায় সকল বস্তুকে গিলে ফেলতে সক্ষম।


প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল ১৬৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার (প্রায়)। এর তুলনায় আলোচ্য বৃত্তাকার তরঙ্গের ক্ষেত্রফল (০.৫ বর্গমিটার) নগণ্য, একদম তুচ্ছ। মার্বেলের আকারও সাগর পৃষ্ঠের তুলনায় অতি ক্ষুদ্র। সমুদ্রের বিভিন্ন প্রান্তে ঢেউটি পৌছিতে পারল না। গুটিকয়েক তরঙ্গ সৃজন করে নিঃশেষ হলো। ক্ষুদ্রশক্তি নিয়ে সাগরের সমগ্র পৃষ্ঠব্যাপি তরঙ্গটি পৌঁছা সম্ভব নয়।


সৃষ্টিকর্তা নিখুঁতভাবে মহাবিশ্ব সৃজন করেছেন, কোনো ত্রুটি নেই। মহাবিশ্বে অসংখ্য অগণিত নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহসহ অজানা আরো কত কিছু রয়েছে। এগুলো প্রায় গোলাকৃতি। মহাবিশ্বের সকল বস্তু ঘূর্ণায়মান। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ৩৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, "আল্লাহতালাই রাত, দিন, সুরূজ ও চাঁদ পয়দা করেছেন; এরা প্রত্যেকেই কক্ষ পথে সাঁতার কেটে যাচ্ছে।" একটির সাথে আরেকটির সংঘর্ষ হয় না। আমাদের সৌর জগতের কথাই ধরা যাক। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো স্ব স্ব কক্ষপথে নির্দিষ্ট গতিবেগে ঘুরছে। ওরা নিজ অক্ষের উপরও ঘুরছে। পৃথিবীতে এজন্য দিবা-নিশি সৃষ্টি হয়। কোনো সংঘর্ষ হয় না। সূর্যের সাথে গ্রহের, গ্রহের সাথে উপগ্রহের কিংবা নক্ষত্রের সাথে নক্ষত্রের সংঘর্ষ হয় না। এতো বিশাল আকারের বস্তুগুলো সৃষ্টিকর্তার আদেশে নির্দিষ্ট সময় ধরে একই নিয়মে মহাকাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবতে অবাক লাগে! গ্রহ বা নক্ষত্রের মধ্যকার ফাঁকাস্থানকে Interstellar Space বা "আন্তঃনাক্ষত্রিক স্থান" বলে। এ সব স্থানে সাঁতার কাটছে মহাবিশ্বের সকল বস্তু।


আমাদের পৃথিবী মহাবিশ্বের অতিক্ষুদ্র এক বস্তু। পৃথিবী নিজ কক্ষপথে প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে চলছে এবং নিজ অক্ষের উপর প্রতি ঘণ্টায় ১৬০০ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে। পৃথিবীর এ গতিবেগকে Spin Motion বলে।


সৃষ্টিকর্তা মানবসন্তানকে মাতৃগর্ভে সৃজন করে ১২০ দিন পর প্রাণ বা আত্মাদেহের (Foetus) সাথে সংযুক্ত করেন। ১০ মাস ১০ দিন (কম বেশি হতে পারে) পরশিশু ভূমিষ্ঠ হয়। অতঃপর মানুষ তাঁর আয়ুষ্কাল অতিবাহিত করে মৃত্যুবরণ করে। আত্মাচলে যায় মহাবিশ্বের বহুমাত্রিক কোনো একজগতে। ইসলামী পরিভাষায় সেই জগতের নাম ইল্লিন অথবা সিজ্জিন। পুণ্যাত্মা চলে যায় ইল্লিনে আর পাপাত্মা চলে যায় সিজ্জিনে। আর দেহ পচে গলে এ জগতে মাটির সাথে মিশে যায়! জীবদ্দশায় পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ মহাবিশ্বের অন্যত্র গমন করতে পারে না। মহাবিশ্বের অতি ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অঞ্চলে মানুষের বিচরণ এবং আয়ুষ্কাল ও অতিঅল্প। সমুদ্রের তুলনায় আলোচ্য বৃত্তাকার তরঙ্গের মতো। বৃত্তাকার ঢেউটি যেভাবে সমুদ্রের বিভিন্ন প্রান্তে (অলিতে-গলিতে) গড়াতে পারেনা তেমনি মানুষ ও তাঁর জীবদ্দশায় পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে (দূর-দূরান্তে) গমন করতে পারে না। তাই আমাদেরকে ভাবতে হবে। মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা এক নগণ্য প্রাণি। আর আমাদেরকে যে মহান স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন তাঁর তুলনায় আমরা কিছুইনা। তাঁর সাথে আমাদের তুলনা চলেনা। মহান রবের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। অতএব, সৃষ্টি কর্তার সৃষ্ট মহাবিশ্বের তুলনায় আমাদের অবস্থান, স্থিতি ও জ্ঞান গরিমা অতি ক্ষুদ্র! বিষয়টি ভেবে দেখা জরুরী।



তাহির আহমদ

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad