ওঠ, খেলা শুরু হয়ে গেছে’

বাবার সেই ডাক আর শোনা হবে না

ওঠ, খেলা শুরু হয়ে গেছে’

রীমা দাস

০৫/০৭/২০২৬ ২২:২৪:৩১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

বিশ্বকাপ মানেই পৃথিবীজুড়ে এক অন্যরকম উন্মাদনা। পাড়া-মহল্লায় উড়তে শুরু করেছে প্রিয় দলের পতাকা, চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই জমে উঠেছে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর যেন নতুন করে মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে।


তবু এবারের বিশ্বকাপ আমার কাছে অন্যরকম।


কারণ, যিনি আমাকে প্রথম ফুটবল চিনিয়েছিলেন, যিনি শিখিয়েছিলেন একটি ম্যাচ শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়, বরং আবেগ, ইতিহাস আর ভালোবাসার গল্প—সেই আমার বাবা এ বছরের শুরুতেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। তাই বিশ্বকাপের উত্তাপ যতই বাড়ছে, ততই স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ছেন তিনি।


আমার ফুটবলপ্রেমের শুরু টেলিভিশনের পর্দায় নয়, বাবার মুখে শোনা গল্পে। তিনি নিজের খেলোয়াড় জীবনের নানা স্মৃতি শুনাতেন। কখনো বলতেন দুর্দান্ত কোনো সেভের কথা, কখনো কোনো ঐতিহাসিক ম্যাচের গল্প। আমি সেসব লিখে রাখতাম। পরে তিনি পড়ে ভুলগুলো ঠিক করে দিতেন, নতুন তথ্য যোগ করতেন। আজ বুঝি, সেসব ছিল কেবল গল্প নয়, ছিল একজন বাবার কাছ থেকে সন্তানের কাছে ভালোবাসার উত্তরাধিকার।


পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের একজন দুর্দান্ত ফুটবলার ছিলেন আমার বাবা। গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল। পরে হকির প্রতিও তাঁর গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়। তবে শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেট, ভলিবল, দাবাসহ নানা খেলায় তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। খেলাধুলাই ছিল তাঁর জীবনের ভাষা।


শৈশবে বাবার একটি পুরোনো খাতা আমাকে ভীষণ কৌতূহলী করত। সেখানে সারি সারি সংখ্যা, দলের নাম আর ম্যাচের ফলাফল লেখা থাকত। তখন বুঝতাম না, কেন এত যত্ন করে এগুলো লিখে রাখা হয়। বড় হয়ে জানতে পারি, সেটি ছিল তাঁর বিশ্বকাপের ডায়েরি। প্রতিটি বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ, গোলসংখ্যা, জয়-পরাজয়—সবকিছু নিজের হাতে লিখে রাখতেন তিনি। এখন মনে হয়, সেটি ছিল শুধু পরিসংখ্যানের খাতা নয়; একজন ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ের দলিল।


বিশ্বকাপের রাতগুলো ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে আনন্দের সময়। বাবা কখনো আমাদের জোর করে জাগাতেন না। খেলা শুরু হওয়ার একটু আগে নরম কণ্ঠে ডাক দিতেন, “ওঠ, খেলা শুরু হয়ে গেছে।” ঘুমজড়ানো চোখে আমরা ভাইবোনেরা টেলিভিশনের সামনে বসে পড়তাম। একটি গোলে যেমন পুরো ঘর আনন্দে ভরে উঠত, তেমনি প্রিয় দল হারলে সবাই একসঙ্গে মন খারাপ করত। সেই মুহূর্তগুলো আজও আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি।


বাবা কোন দলকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করতেন, সেটা তিনি কখনো স্পষ্ট করে বলতেন না। তবে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের আগে তাঁর কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে এক আড্ডায় প্রথম বুঝতে পারি, আর্জেন্টিনার প্রতি তাঁর আলাদা টান ছিল। আলোচনায় বারবার উঠে আসছিল দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম। বাবার এক বন্ধু মজা করে বলেছিলেন, মাঠে খেলার সময় নাকি তাঁর খেলায় কখনো ম্যারাডোনা, কখনো পেলের ছায়া দেখা যেত।


হয়তো সেদিন থেকেই অজান্তেই আর্জেন্টিনা আমারও প্রিয় দলে পরিণত হয়। তবে আফ্রিকার দলগুলোর প্রতিও আমার আলাদা ভালোবাসা ছিল। নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন কিংবা ঘানার প্রাণবন্ত ফুটবল আমাকে সবসময় মুগ্ধ করত।


আজ আবার বিশ্বকাপ এসেছে। নতুন নায়ক তৈরি হবে, নতুন ইতিহাস লেখা হবে, কোটি কোটি মানুষ আনন্দে ভাসবে। কিন্তু আমার কাছে এবারের সবচেয়ে বড় শূন্যতা কোনো খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি নয়, কোনো দলের বিদায়ও নয়। আমার সবচেয়ে বড় শূন্যতা—বাবা।


এবারও খেলা শুরু হবে গভীর রাতে। টেলিভিশনের পর্দায় বল গড়াবে, গ্যালারি গর্জে উঠবে, বিজয় উদযাপনে মেতে উঠবে পৃথিবী। শুধু আমার ঘরের দরজায় আর কেউ কড়া নেড়ে বলবে না, “ওঠ, খেলা শুরু হয়ে গেছে।”


হয়তো বাবার সেই পুরোনো বিশ্বকাপের খাতায় আর নতুন কোনো ফলাফল লেখা হবে না। কিন্তু আমার হৃদয়ের পাতায় তাঁর লেখা স্মৃতিগুলো কোনোদিন মুছে যাবে না।


বিশ্বকাপ আসবে, যাবে। নতুন চ্যাম্পিয়ন হবে, নতুন কিংবদন্তির জন্ম হবে। কিন্তু আমার কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিচয় একটাই—এটি বাবার সঙ্গে কাটানো অমূল্য সময়ের আরেকটি নাম। যতদিন ফুটবল থাকবে, ততদিন বাবাও থাকবেন—আমার প্রতিটি বিশ্বকাপের স্মৃতিতে, প্রতিটি বাঁশির শব্দে, প্রতিটি গোলের উল্লাসে।


লেখক : -

রীমা দাস

উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সংস্কৃতিকর্মী

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: