আজ মহান বিজয় দিবস : বিজয়ের ক্যানভাসে হাওরকন্যা সুনামগঞ্জ
১৬ ডিসেম্বর আমাদের অহংকার, আমাদের বিজয়ের দিন। লাল-সবুজের পতাকায় মোড়ানো এই দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে সারাদেশের মতো হাওরকন্যা সুনামগঞ্জের ইতিহাসও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। এই ভাটির জনপদ ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধের এক কৌশলগত কেন্দ্র। বিজয়ের এই দিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেইসব বীর সন্তানদের, যাঁরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে এই জনপদকে স্বাধীন করেছেন।
ভৌগোলিক কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় সুনামগঞ্জ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র। পুরো সুনামগঞ্জ জেলা ছিল ৫ নম্বর সেক্টরের অধীন, যার কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী (বীর উত্তম)। এই সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল টেকেরঘাট (তাহিরপুর)। তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাট ছিল ৫ নম্বর সেক্টরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাব-সেক্টর সদর দপ্তর এবং প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এটি শুধু প্রশিক্ষণের স্থান ছিল না, সীমান্তের ওপার থেকে আসা সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ সংরক্ষণেরও প্রধান কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলাই নদী সংলগ্ন বাঁশতলা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মৃতিবিজড়িত স্থান। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটিকে সাব-সেক্টর এবং হেডকোয়ার্টার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এখান থেকেই মূলত সুনামগঞ্জ ও এর আশেপাশের এলাকায় যুদ্ধের ছক কষা হতো। বাঁশতলার স্মৃতিসৌধ আজও সেই উত্তাল দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই সীমান্ত ঘাঁটিগুলি থেকে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুপক্ষের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে একের পর এক গেরিলা হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে দেন।
সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধে ‘দাস পার্টি’র নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। শাল্লা, দিরাই ও আজমিরীগঞ্জ এলাকায় জগৎজ্যোতি দাস (বীর বিক্রম)-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গেরিলা বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল। ভাটি অঞ্চলের জলপথ ও ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে একের পর এক সফল অপারেশন চালিয়েছেন। জগৎজ্যোতি দাসের বীরত্বগাঁথা আজও হাওরপারের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ছাতক ও দোয়ারাবাজারের যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রক্তক্ষয়ী। এই অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একের পর এক আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
সুনামগঞ্জের মুক্তি সংগ্রামকে যাঁরা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মেজর সি. আর. দত্ত ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। তাঁর সামরিক দক্ষতা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মুক্তিসংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ করে ছাতক আক্রমণে নেতৃত্ব দেন।
ক্যাপ্টেন এ. কে. এম. মহিউদ্দিন আহমেদ ৫ নম্বর সেক্টরের লড়াকু অধিনায়ক। ছাতক-দোয়ারাবাজার এলাকায় তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ৫ নম্বর সেক্টরের উপ-সেক্টর কমান্ডার (রাজনৈতিক উইং) এবং সক্রিয় যোদ্ধা। দিরাই-শাল্লার হাওর অঞ্চলে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং গেরিলাদের সংগঠিত করেন। মেজর দত্তের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সাংগঠনিক দক্ষতা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বিজয়ের আনন্দ আছে, তবে স্বজন হারানোর বেদনাও কম নয়। সুনামগঞ্জ পিটিআই স্কুল, শ্রীরামসী, ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলাকা এবং ডলুরাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বধ্যভূমি ও গণকবর। নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাকিস্তানিরা চেয়েছিল এদেশের মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে, কিন্তু সুনামগঞ্জের বীর জনতা তা হতে দেয়নি।
পিটিআই বধ্যভূমি (সদর): শহরের প্রধান বধ্যভূমি ও টর্চার সেল। এখানে বহু মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষকে নির্মম নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল।
শ্রীরামসী বধ্যভূমি (জগন্নাথপুর): ১৯৭১ সালের ৩১ আগস্ট, স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ১২৬ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।
শ্যামারচর বধ্যভূমি (দিরাই): ৬ ডিসেম্বর, সুনামগঞ্জ মুক্ত হওয়ার দিনটিতেই শ্যামারচর বাজারে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ধরে নিয়ে সুরমা নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করা হয়।
রাণীগঞ্জ বধ্যভূমি (জগন্নাথপুর): ২ সেপ্টেম্বর, প্রায় ৩০-এর অধিক বাজারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে ধরে কুশিয়ারা নদীর তীরে নিয়ে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
ডলুরা শহীদ সমাধি (সদর): এটি বধ্যভূমি না হলেও ৪৮ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার শেষ শয্যা হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এটি এখন পবিত্র স্থান হিসেবে সংরক্ষিত।
মাধবপুর বধ্যভূমি (ছাতক): এখানে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে ‘শিখা সতেরো’ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন হানাদার বাহিনীকে যারা সহায়তা করেছে, বিশেষ করে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী, তাদের ঘৃণ্য ভূমিকার কারণে এই বধ্যভূমিগুলোতে ব্যাপক সংখ্যক বাঙালি জীবন হারায়। তাদের সহযোগিতায় হানাদাররা গ্রাম-গঞ্জে ঢুকে লুটপাট, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাত।
যদিও ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়, কিন্তু সুনামগঞ্জ শহর শত্রুমুক্ত হয়েছিল তার আগেই। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভোররাতে মুক্তিপাগল জনতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সুনামগঞ্জ শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
তখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সুরমা নদীর তীর। সেই ভোরে পিটি স্কুল (বর্তমান সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়) প্রাঙ্গণে প্রথম ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা।
আজকের এই বিজয় দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু অতীত রোমন্থন করছি না, বরং শপথ নিচ্ছি নতুন করে। সুনামগঞ্জের যে বীর সন্তানেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে আমাদের এই স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং অবহেলিত বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করাই হোক এবারের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: