মিষ্টি সুভাষকে রিমান্ডে পাঠানোর রায়,ক্ষত-বিক্ষত স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়
মো: মহসিন খান
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার মূল্যবোধ—এই শব্দগুলো শুধু স্লোগান নয়; এগুলো আমাদের অস্তিত্বের শেকড়, আমাদের রাষ্ট্রের ভিত্তি। সেই ভিত্তিতে যেন আরেকবার আঘাত হানা হলো, যখন আদালত মিষ্টি সুভাষ–এর বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত পুলিশি অনুরোধ মেনে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন। এই রায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী কোটি মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
মিষ্টি সুভাষ কোনো দুর্ধর্ষ অপরাধী নন, কোনো অরাজক শক্তির অংশ নন—তিনি একজন তরুণ-তরুণীদের অনুপ্রেরণা, একজন সচেতন নাগরিক, যিনি নিজের মত প্রকাশ করেছেন, নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। অথচ তাঁর মতপ্রকাশের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাকে রিমান্ডে পাঠানো হলো এমন এক সময়ে, যখন দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর রিমান্ড-অত্যাচারের ইতিহাস মানুষকে আতঙ্কিত করে রাখে।
এই রিমান্ড আসলে কী বার্তা দেয়?
এ রিমান্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র যেন বলছে—
“তুমি কথা বললে শাস্তি পাবে, প্রশ্ন করলে নিপীড়ন ভোগ করবে।”
এটি স্বাধীনতার চেতনার সরাসরি অপমান। যে স্বাধীনতা ১৯৭১–এ অর্জিত হয়েছিল মানুষের মতপ্রকাশ, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য—সেই স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরে একজন তরুণীকে এভাবে রিমান্ডে পাঠানো গভীর উদ্বেগের কারণ।
রিমান্ডের ইতিহাস আমাদের কী শিখিয়েছে?
বাংলাদেশে রিমান্ড মানে প্রায়শই—
শারীরিক ও মানসিক চাপ,
জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়,
ভয় দেখানো,
এবং বিরোধী মতকে দমন করার হাতিয়ার।
এ বিচারহীন সংস্কৃতি বারবার মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়েছে। অথচ আদালতের এই সিদ্ধান্ত যেন সেই পুরোনো দুঃস্বপ্নকে আবারও জীবিত করল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি শুধুই মুখের বুলি?
স্বাধীনতার বাংলাদেশে একজন মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা সর্বোচ্চ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু মিষ্টি সুভাষকে রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনাটি প্রমাণ করে—
আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যবোধ ধারণ করতে পারেনি।
মুক্তিযোদ্ধারা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?
যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই রিমান্ড?
যেখানে নারী নিরাপত্তাও নিশ্চয়তা পায় না?
যেখানে আদালতের সিদ্ধান্ত মানুষের মনে আস্থা সৃষ্টি না করে বরং ভয় ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে?
জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া: প্রতিবাদই একমাত্র পথ
এই রায় শুধু মিষ্টি সুভাষের বিরুদ্ধে নয়—এটি প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা।
সুতরাং এই সময় দরকার—
জোরালো প্রতিবাদ,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া,
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া,
বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা দাবি করা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার লড়াই আজও শেষ হয়নি।
আজ মিষ্টি সুভাষ, কাল হয়তো আরেকজন।
রাষ্ট্র যদি মানবাধিকার অবমাননার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, তবে জনগণই হবে তার প্রকৃত প্রতিরোধশক্তি।
শেষ কথা
মিষ্টি সুভাষকে রিমান্ডে পাঠানোর সিদ্ধান্ত যে আঘাত দিয়েছে তা সামান্য নয়। এটি ন্যায়ের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে দুর্বল করেছে, স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতিতে আঘাত করেছে, এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবমাননা হিসেবে মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন শুধু মিষ্টি সুভাষের প্রতি সংহতি নয়—এটি স্বাধীনতার বাংলাদেশকে রক্ষার সংগ্রাম।
লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: