যুক্তরাজ্যে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ফাহিম আল ইসহাকই আলোচিত 'ফাহিম চৌধুরী'!
যুক্তরাজ্যে একাধিক প্রতারণা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামি দেশে ফিরে ছদ্মনাম ও ভুয়া বংশীয় পরিচয় ব্যবহার করে রাতারাতি 'শিল্পপতি' ও 'সমাজসেবক' বনে যাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের খবর ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ব্যক্তির আসল নাম ফাহিম আল ইসহাক। তবে বাংলাদেশে এসে তিনি নিজেকে 'চৌধুরী' হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম The Evening Telegraph-এ ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ফাহিম আল ইসহাকের জালিয়াতির বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ২৩,০০০ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পঁচিশ লক্ষাধিক টাকা) আত্মসাৎ করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে। মোট ৫টি ভিন্ন ভিন্ন প্রতারণা মামলায় ব্রিটিশ আদালত তাকে ৩ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।
যুক্তরাজ্যে আইনি সাজা এড়াতে দেশে পালিয়ে এসে ফাহিম আল ইসহাক সম্পূর্ণ নতুন কৌশলের আশ্রয় নেন। নিজের অপরাধের অতীত ঢাকতে তিনি নামের শেষে 'চৌধুরী' পদবি ব্যবহার শুরু করেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিপুল অর্থবল, কিছু সুবিধাভোগী কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে তিনি রাতারাতি নিজেকে একজন বড় মাপের শিল্পপতি হিসেবে জাহির করেন। নিজেকে পরিচিত করতে বিপিএল (বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ) সহ বিভিন্ন চাকচিক্যময় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, কনসার্ট এবং লোকদেখানো কিছু সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্পন্সর বা পৃষ্ঠপোষক সাজেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সুপরিকল্পিত পিআর (জনসংযোগ) ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে নিজেকে সমাজের উঁচুতলার মানুষ এবং তরুণদের আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালান তিনি।
সামান্য টাকা ও মিডিয়া হাইপকে কাজে লাগিয়ে একজন আপাদমস্তক সাজাপ্রাপ্ত প্রতারকের এভাবে সমাজসেবক কিংবা বড় নেতা সেজে যাওয়া এ দেশের প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। ফাহিম আল ইসহাকও ঠিক একই পথে হাঁটছিলেন। এই মেকি জনপ্রিয়তার আড়ালে মূলত তিনি নিজেকে সামনের একটি বড় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করছেন এবং জোরেশোরে প্রচারণাও শুরু করেছেন।
এতদিন বিনোদন ও সমাজসেবার আড়ালে ফাহিম আল ইসহাকের ব্যক্তিগত ও অপরাধমূলক অতীত ঢাকা থাকলেও, অতি সম্প্রতি একটি বিতর্কে জড়ানোর পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তার আসল চেহারা জনসমক্ষে চলে আসে। যুক্তরাজ্যের আদালতের সাজার রায় এবং সংবাদমাধ্যমের মূল প্রতিবেদিনের কপি রাতারাতি ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
আরও মজার তথ্য হলো, তিনি সিলেটে একটি নাটকে অভিনয়ও করেছেন। সিলেটের প্রয়াত সাংবাদিক ম. আনফর আলী রচিত একটি নাটকে অভিনয়কালে তিনি ছিলেন ফাহিম আল ইসহাক। তখন হাতে ছিল একটা সাধারণ ব্ল্যাকবেরি মোবাইল। কিন্তু কে জানত, ওই একটা মোবাইলই তার ভাগ্য বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি হয়ে উঠবে! সেই ব্ল্যাকবেরি দিয়ে অনলাইনে শুরু হয় হ্যাকিংয়ের দুনিয়ায় পথচলা। আর একের পর এক নিখুঁত সব 'অপারেশন' আর সফল ফলাফল! কাজ সফল হওয়া মাত্রই যার স্বভাব ছিল বন্ধুদের নিয়ে সাথে সাথে জমজমাট পার্টির আয়োজন করা।
ফাহিম আল চৌধুরীর এই অতীত প্রকাশ্যে আসতেই নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে হাজারো ট্রল ও মিম। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—কীভাবে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি দেশের বড় বড় ইভেন্টে পৃষ্ঠপোষকতা করার সুযোগ পায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে জায়গা করে নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়। তার এই তথাকথিত 'মিডিয়া ইমেজ' এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
এই তথ্য ফাঁসের পর সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দেশের সেইসব কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইনফ্লুয়েন্সার এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা, যারা তার আসল পরিচয় না জেনে কিংবা অন্ধ মোহে তার ঢালাও প্রচার ও দালালি করছিলেন। একজন দাগী আসামিকে 'বংশীয় চৌধুরী' কিংবা 'দানবীর' ভেবে যারা এতদিন তার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, নেটিজেনদের তোপের মুখে তারা এখন চরম নৈতিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ফাহিমের সাথে থাকা তাদের পুরনো ছবি ও ভিডিও সরিয়ে নিচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে ‘কথিত’ ফাহিম আল চৌধুরীর মন্তব্য জানার জন্য তাঁর বেশ কয়েকজন ঘণিষ্টজনকে কল দিলেও কেউ নাম্বার দিতে রাজি হন নি। ফলে মন্তব্য আদায় করা সম্ভব হয় নি।
সচেতন মহল মনে করছেন, ফাহিম আল ইসহাকের জালিয়াতি ও অপরাধের খতিয়ান এভাবে উন্মোচিত হওয়ার পর আসন্ন মেয়র নির্বাচনে তার মনোনয়ন পাওয়া বা ভোটের মাঠে টেকার সম্ভাবনা এখন পুরোপুরি শূন্যের কোঠায়। অর্থ, পিআর এজেন্সি ও সস্তা প্রচারণার জোরে সমাজে অপরাধীদের এভাবে রাতারাতি তারকা ও নেতা বনে যাওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতার বিরুদ্ধে এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র গণপ্রতিরোধের সুর দেখা যাচ্ছে। একজন আন্তর্জাতিক অপরাধীর এমন চাতুর্যপূর্ণ উত্থানের নেপথ্যে কারা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সাধারণ নাগরিকরা।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: