মিথ্যা ন্যারেটিভ বনাম পাল্টা চ্যালেঞ্জ: সিলেটে দুই আলেমকে ঘিরে তোলপাড়
সিলেটের দুই প্রভাবশালী ধারার আলেম ও তাঁদের অনুসারীদের কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র উত্তেজনা ও বাদানুবাদ তৈরি হয়েছে। আল্লামা ফুলতলীর (র.) পৌত্র ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা হুসামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর একটি রাজনৈতিক বক্তব্য এবং এর জবাবে তরুণ আলেম মাওলানা সাদিক সিকান্দারের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। বর্তমানে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উভয় পক্ষের অনুসারী ও সাধারণ নেটিজেনদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং পাল্টাপাল্টি ফটোকার্ড শেয়ারের মাধ্যমে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
সম্প্রতি সিলেটে দুই ঘরানার আলেম ও তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত ১০ মে ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারে এক সমাবেশে সাবেক সংসদ সদস্য ও আলেম মাওলানা হুসামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর দেওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্য এবং এর জবাবে তরুণ আলেম মাওলানা সাদিক সিকান্দারের একটি ফেসবুক পোস্টের পর থেকে এই বাদানুবাদের সূত্রপাত। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সাইবার যুদ্ধ, আইআই (AI) দিয়ে তৈরি বিতর্কিত ছবি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক গালমন্দের ঝড় বইছে।
ঘটনার সূত্রপাত: মাওলানা হুসামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর বক্তব্য
গত ১০ মে সিলেটের ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারে এক সমাবেশে বক্তব্য দেন মাওলানা হুসামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। দীর্ঘ সময় ধরে দেওয়া সেই বক্তব্যে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। পরবর্তীতে তাঁর দল ও মতাদর্শের কর্মীরা সেই বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ দিয়ে ‘ফটোকার্ড’ তৈরি করে ফেসবুকে প্রচার করতে থাকেন। এর মধ্যে একটি ভাইরাল হওয়া ফটোকার্ডে দেখা যায়, তিনি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলটিকে ‘দাজ্জালের ফেতনা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, "জান্নাতের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে, এদের থেকে সাবধান।"
মাওলানা সাদিক সিকান্দারের ফেসবুক পোস্ট ও চ্যালেঞ্জ
মাওলানা হুসামুদ্দীন চৌধুরীর এই বক্তব্যের পর রাতে তরুণ আলেম মাওলানা সাদিক সিকান্দার নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন। তিনি এই ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’র দাবিটিকে ‘মিথ্যা অপপ্রচার’ আখ্যা দিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।
সাদিক সিকান্দার তাঁর পোস্টে লেখেন, জামায়াতের নায়েবে আমীর প্রফেসর মুজিবুর রহমান জাতীয় সংসদে জান্নাতের টিকিট বিক্রি প্রসঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে (তারেক রহমান) সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যা কেউ খণ্ডন করতে পারেনি। তিনি হুসামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন:
"জামায়াতকে বা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার বিনিময়ে জান্নাতের টিকিট দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো টিকিটের নমুনা সাহেবজাদা ফুলতলী দিতে পারবেন? বলতে পারবেন কে কোথায় এভাবে টিকিট বিক্রি করেছে? আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম, কেউ পারলে একটা নমুনা টিকিট দিন যা জামায়াত সরবরাহ করেছে। ফালতু তথ্য না হয় রাজনীতিবিদরা দিলেন, কিন্তু একজন আলেম ও পীরপুত্র এটা কেন করতে যাবেন, এটিই আমার প্রশ্ন।"
গালমন্দ ও এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার
সাদিক সিকান্দারের এই পোস্টের পর থেকেই ফুলতলী অনুসারী ও জামায়াত-বিরোধীদের একটি বড় অংশ তাঁর ওপর চড়াও হয়। ফেসবুকে তাঁর ছবি শেয়ার করে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ এবং চরিত্রহননের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের বিকৃত ফটোকার্ড তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের নামে বিভিন্ন কাল্পনিক ও মিথ্যা অপবাদ রটানো হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া
হুসামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর সমর্থক ও নেটিজেনদের একটি অংশের দাবি, জামায়াতে ইসলামী অতীতেও ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। তাদের মতে, ‘জান্নাতের টিকিট’ বা ইসলামের নামে ভোট চাওয়ার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তারা তৈরি করেছিল, সেটির বিরুদ্ধে কথা বলা একজন দায়িত্বশীল আলেমের কাজ। একজন পীরপুত্র এবং প্রবীণ আলেমকে একজন তরুণ আলেম যেভাবে ভাষায় আক্রমণ বা ‘চ্যালেঞ্জ’ করেছেন, তা চরম আদব পরিপন্থী ও উসকানিমূলক। এই কারণেই সামাজিক মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
সাদিক সিকান্দারের সমর্থক ও সাধারণ নেটিজেনদের বক্তব্য:
অন্যদিকে, সাদিক সিকান্দারের সমর্থক ও একটি বড় অংশের সচেতন তরুণদের বক্তব্য হলো, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া একটা রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দলের বিরুদ্ধে ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’র মতো গুরুতর মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করা অন্যায়। তাদের প্রশ্ন—কেউ যৌক্তিক সমালোচনা বা প্রমাণ চাইলে কেন তাঁর ওপর এভাবে হিংস্র হয়ে উঠতে হবে? গালমন্দ, হুমকি-ধমকি এবং এআই দিয়ে ভুয়া ছবি বানিয়ে কাউকে দমানোর এই সংকীর্ণ মানসিকতা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। অতীত বা বর্তমান—কোনো প্রজন্মকেই এভাবে সাইবার বুলিং করে মুখ বন্ধ রাখা যাবে না।
সমাজ বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
সিলেটের সুশীল সমাজ ও নিরপেক্ষ ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, আলেমদের মধ্যে রাজনৈতিক বা আদর্শিক মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদ যখন কাদা-ছোড়াছুড়ি, অশ্লীল গালমন্দ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের (যেমন AI ভুয়া কার্ড) পর্যায়ে চলে যায়, তখন তা পুরো সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কৃতির জন্য অবক্ষয় ডেকে আনে। মিথ্যা প্রোপাগান্ডা এবং হুমকির সংস্কৃতির পরিবর্তে যেকোনো বিষয়ে সুস্থ, তথ্যভিত্তিক ও মার্জিত বিতর্কের পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: