মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতির সিলেট ওসমানী জাদুঘর
Led Bottom Ad

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতির সিলেট ওসমানী জাদুঘর

ইফতেখারুল হক পপলু

০১/১২/২০২৫ ২১:২২:০৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

কেমন ছিলেন আমাদের বঙ্গবীর । আমাদের অহংকার। আমাদের সর্বাধিনায়ক। আমাদের ওসমানী। ৫ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার হালকা-পাতলা গড়নের লোকটি নাকি ছিলেন খুব সাদামাটা। হ্যাঁ তার সাথে সাক্ষাত‌ও করা যাবে। কাছ থেকে দেখা যাবে কেমন মানুষ তিনি; কিন্তু কথা বলা যাবে না। । কারণ তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। নামাজের চৌকিতে জায়নামাজ বিছিয়ে রেখে গেছেন। টুপিটা ও আছে। যেন একটু পরেই আসবেন। নামাজ পড়বেন....।


মৃত মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হবে কিভাবে এ প্রশ্ন জাগতেই পারে। ‌ উত্তর পেতে হলে, ওসমানীর সাথে সাক্ষাৎ করতে হলে যেতে হবে সিলেট শহরের ধোপাদিঘির পারে। ওখানে ওসমানীকে পাওয়া যাবে। জানা যাবে তার সম্বন্ধে। দেখা যাবে তার কীর্তি। কারণ ওখানে তিনি থাকতেন। ঘুমোতেন। খাবার খেতেন। ৬৬ তম জন্মদিনের কেকটিও কেটেছেন এখানে। আজও আছেন। তবে প্রতিকৃতি হয়ে। আছেন জাদুঘরের চার দেওয়ালে।


তাই জাদুঘরেই প্রতিটি কক্ষে, প্রতিটি ইটের সাথে মিশে আছে ওসমানীর স্মৃতি। এই জাদুঘর‌ই আজ ওসমানী কে জানার অন্যতম মাধ্যম।

ওসমানী জাদুঘর। ওসমানীর স্মৃতিকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুই শতকের বেশি সময়। জাদুঘরটি পরিচালনা করছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এক সময়ের নূর মঞ্জিলই আজ ওসমানী জাদুঘর। ওসমানী জাদুঘর যেন যোদ্ধা ওসমানী, ব্যক্তি ওসমানী , রাজনৈতিক ওসমানীর এক নীরব প্রতিকৃতি। ওখানে রয়েছে ওসমানীর ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী,  মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনার বহু দলীল দস্তাবেজ। রয়েছে বহু দুর্লভ-ছবি চিত্রকর্ম।


সময়সূচী:

 তিনটি গ্যালারিতে বিভক্ত জাদুঘরটি উন্মুক্ত রয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য। বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত যে কেউ দেখে আসতে পারেন ওসমানীকে, ওসমানী জাদুঘরকে। তবে শুক্রবার বিকাল তিনটা থেকে রাত ৮ টা। আর বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি। 

যেখানে যা আছে: প্রায় দুই বিঘা জমির উপর ওসমানী জাদুঘর। মূল সড়কের পাশ ঘেঁষে তিন দিকে বৃক্ষরাজীর ছায়া সুনিবিড় পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেমিপাকা টিনশেড এর বাংলো। জীবিত কালে এই ঘরটিতে থাকতেন ওসমানী। সামনে খোলা বারান্দা। বাংলোতে বড় পরিসরের তিনটি রুম। পেছনের দিকেও বারান্দা। ঠিক পশ্চিমের রুমটিতে থাকতেন ওসমানী, যেটিকে এখন জাদুঘরের ১ নং গ্যালারি করা হয়েছে। মধ্যখানের রুমটি ছিল অতিথীদের জন্য। এটি এখন ২ নং গ্যালারি। বাংলোর পূর্ব প্রান্তের রুমটি ডাইনিং হিসেবে ব্যবহার করতেন ওসমানী । এই রুমটি এখন ৩ নং গ্যালারি। 


১৯৮৫ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর নগরীর ধোপাদিঘির পাড়ে ওসমানীর পৈত্রিক বাড়ি নূর মঞ্জিল এ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ওসমানী জাদুঘরের। দু'বছর পর ১৯৮৭ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। ওসমানী জাদুঘরের স্বত্ত্ব দি জুবেদা খাতুন- খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্টের। ওসমানীর বড় ভাই নুরুল গণির নামে বাড়িটির নাম রাখা হয় নূর মঞ্জিল।


গ্যালারী এক: 

গ্যালারির এই রুমটিতে তাকালে চোঁখে ভেসে উঠে এক সাদামাটা সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত ওসমানীর প্রতিকৃতি। শিশুকালে পিতার কোলে ওসমানী থেকে শুরু করে শেষ বয়সে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের চিকিৎসাধীন ওসমানের ছবি আজও কথা বলে যায়।

ওসমানীর নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখা হয়েছে এই গ্যালারিতে। জীবদ্দশায় যেটি যেভাবে ছিল ঠিক যেন আজও সেটি সেভাবে আছে। চমৎকার কালচে রঙের একটি খাট। বিছানাসহ ১টি বালিশ ও ১ টি কম্বল। খাটের পেছনের আলনাতে রাখা আছে তার ব্যবহৃত ২ টি শার্ট, ১টি তোয়ালে, ১টি কোট, ১টি সোয়েটার, ৩ টি  পাঞ্জাবি। আরো আছে ১টি ছাতা, ১ টি লাঠি, ৪ জোড়া জুতো। রুমের এক কোনে এক রাখা কালচে রঙের ওয়াডর্ডোব যেন সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ; যাতে তথ্য বিকৃতির ছোঁয়া স্পর্শ করতে না পারে। আরো আছে চারটি বেতের চেয়ার, মধ্যখানে ১টি ছোট টেবিল, ১ টি ফোন সেট। টেবিলের ওপর রাখা আছে মুজিবুর রহমান বিশ্বাস রচিত সমাজতন্ত্র কেন প্রয়োজন ও বাংলাদেশ আর্ম মেডিকেল জার্নাল বই দুটি। বহু পুরনো অনেক ম্যাগাজিন আর বই পুস্তকে ভরে আছে ১ বুক সেলফ। এছাড়াও আছে ১৯৮৩ সালের ১ লা  সেপ্টেম্বর ৬৬ তম জন্মদিনে শেষ কেক কাটায় ওসমানীর ছবি।


গ্যালারি ২: 

গ্যালারির এই রুমটি বলতে গেলে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ছোঁয়া এনে দেয়। ২ নং সেক্টরের একটি হাসপাতাল পরিদর্শনে ওসমানীর একটি ছবি এখনও জানান দেয় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পাক হানাদার বাহিনীর বিভৎসতার কথা। ওসমানী ৭১ এ গার্ড অফ অনার প্রধান কিংবা ওসমানীর যশোর মুক্তাঞ্চল পরিদর্শকের দৃশ্যটি চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে বড় দুটি চিত্রকর্মের মাধ্যমে। সেই সাথে আছে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাশে ভাষণরত ওসমানীর ছবি। সযত্নে রক্ষিত আছে বঙ্গবীর ওসমানীর পাসপোর্ট। আছে পদক, ব্যাজ ও ১২ টি উপহার সামগ্রী। সুদৃশ্য তিনটি ছুরি উপহার সামগ্রীর তালিকাকে করেছে সমৃদ্ধ। রয়েছে ৮ টি মেডেল আর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি চিরকুট। আছে ১৯৮৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারের সনদ। 


২ নং গ্যালারিতে কিছু দুর্লভ চিত্রকর্ম দিয়ে তুলে আনা হয়েছে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে নতুন প্রজন্মের জন্য। আছে ১৯৭১ সালের গণহত্যার ছবি, গণহত্যা থেকে বাঁচতে আদিবাসীদের সীমান্ত অতিক্রম। ‌ যুদ্ধ পরিচালনা ও কৌশল নির্ধারণে ওসমানীর কর্মতৎপরতা। করুণভাবে উঠে এসেছে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া নর-নারীদের অসহায় অবস্থা। সেক্টর কমান্ডারদের সাথে ওসমানী,  যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর ছবি যেন বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের জীবন্ত কাহিনী হয়ে ফুটে ওঠেছে। সেই সাথে আছে যৌথ বাহিনীর স্বাক্ষর গ্রহণের অনুষ্ঠানের চিত্রকর্ম। 


গ্যালারি ৩ :


এখানে আছে আনুষ্ঠানিক ১০ ফুট/ ১২ ফুট এর একটি মানচিত্র, বলতে গেলে এই মানচিত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্লভ দলিল। এই মানচিত্র যুদ্ধ পরিকল্পনা ও পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হতো। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ এবং ১৯৭৪ সালে শহীদ স্মরণিতে মাল্যদানের ছবি ফটো ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখা আছে এখানে। আছে শাহজালাল (রহ) এর  দরগাহ জিয়ারতের ছবি। 


গ্যালারি ৩ এর রুমে আছে ১ টি ছোট খাট বিছানা সহ ও ১ টি ওয়াডড্রোব‌। খাবার টেবিলের উপর সাজানো আছে ৬ টি প্লেট, ১ টা ডিশ, ১ টি ব‌উল, ১ টি মাঝারি চামচ। টেবিলের পাশে দাঁড়ালে মনে হয় কখন জানি এসে বসে পড়বেন জেনারেল ওসমানী অতিথিদের নিয়ে। আছে ১টি ফ্রিজ। খাটের পাশে নামাজের চোকি, চৌকির উপরে জায়নামাজ, পাশে এক কোনে রাখা টুপি ধর্মের প্রতি ওসমানীর গভীর বিশ্বাস বোধের কথাই তুলে ধরে। বরিশাল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় পরিদর্শনে গেলে তাকে সংসদের পক্ষ থেকে একটি মানপত্র দেওয়া হয়। কাগজ কেটে মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি তৈরি করে তার উপরে হাতে লেখা মানপত্র সত্যিই এক চমৎকার শিল্পকর্ম বলা চলে। 


জাদুকর রক্ষণাবেক্ষণ এর দায়িত্বে আছেন সহকারী কিপার এস এম জালাল উদ্দিন ( ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সাল )। প্রতিবেদন সংগ্রহের সময় আলাপকালে তিনি জানান শীঘ্রই জাদুঘরে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী চালুর পরিকল্পনা আছে। মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে ওসমানী জাদুঘর পরিচালিত হলেও এটি একটি ট্রাস্টি বোর্ডের কিছু শর্তের কাছে দায়বদ্ধ। শর্ত কি জানতে চাইলে তিনি বলেন জাদুঘরের কোন উন্নয়ন কাজ করতে হলে অবশ্যই এর মূল কাঠামোকে অবিকৃত রেখে করতে হবে। 


তিনি সিলেটসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন যদি কারো কাছে ওসমানীর কোনো নিদর্শন তাকে তবে তা যেন জাদু করে দান করা হয়‌ । যিনি ডকুমেন্ট প্রদান করবেন জাদুঘরে তাঁর নামসহ পরিচিতি সংরক্ষণ করা হবে বলেও জানান তিনি। 

সিলেটের বুক জুড়ে ধোপাদিঘীর পাড়ে নুর মঞ্জিলে গড়ে ওঠা ওসমানী জাদুঘর বাংলাদেশের গর্ব এবং গৌরবের এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে রয়েছে যার ঐতিহাসিক যোগসূত্র। যে কেউ চাইলেই দেখে আসতে পারেন এই জাদুঘরটি আর নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাথে। 


বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই প্রতিবেদনটি মূলত এক সময়ে সিলেটে মুক্ত তথ্য মুক্ত প্রাণ এই আহ্বান নিয়ে সাংবাদিক আহমেদ নূর সম্পাদিত সৃজনশীল পত্রিকা দৈনিক সিলেট প্রতিদিন এর জন্য করা। সেই সময় সিলেট প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার ইফতেখারুল হক পপলু প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। প্রতিবেদনটি ১৭ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সাল,  ১৭ ভাদ্র ১৪১৩ বাংলা শুক্রবার সিলেট প্রতিদিন এ প্রকাশিত হয়। জাদুঘরের সময়সূচি কিংবা গ্যালারির অবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিবর্তন হতে পারে।।


ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad
Led Bottom Ad