সিলেটে উৎপাদনে ঘাটতি নেই, তবুও উধাও এলপি গ্যাসের সরকারি বোতল
সিলেটের কৈলাশটিলায় মাসে উৎপাদিত প্রায় ৩০ হাজার সরকারি এলপি গ্যাসের বোতল বাজারজাত হচ্ছে—কিন্তু সাধারণ গ্রাহক পাচ্ছেন না একটি বোতলও। সরকারি দামে ৮২৫ টাকার গ্যাস বাজারে মিলছে না; বরং বেসরকারি কোম্পানির বোতল ১২৯০ থেকে ১৫০০ টাকায় সয়লাভ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন—সরকারি গ্যাসের বোতলগুলো কালোবাজারীদের মাধ্যমে বেসরকারি বোতলে 'ক্রসিং' করে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে, আর এতে জড়িত রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটচক্র।
সূত্র মতে, অক্টোবর ২০২৫ মাসে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে ৩০ হাজার সরকারি এলপি গ্যাসের বোতল বাজারজাত করা হয়েছে। চলতি মাসের ১২ তারিখ পর্যন্ত প্রতিটি কোম্পানিতে ৩৬৪০টি করে মোট ১০,৯২০ বোতল সরবরাহ দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার কিংবা হবিগঞ্জ—কোথাও একটি সরকারি বোতলও পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে এ বিপুল পরিমাণ বোতল যায় কোথায়—এ প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব। তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে—বেসরকারি কোম্পানির গ্যাসে বাজার ভরপুর। একজনও খুচরা ব্যবসায়ী সরকারি গ্যাস পাচ্ছেন না। সরকারি এলপি গ্যাস (১২ কেজি) : ৮২৫ টাকা, বেসরকারি গ্যাস : ১২৯০–১৫০০ টাকা
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—সরকারি গ্যাস সস্তা হওয়ায় সিন্ডিকেট তা বাজারে ছাড়ছে না। প্রতিটি সরকারি বোতলে প্রায় ৫০০ টাকা লাভ হওয়ায় বেসরকারি বোতলে ভরে বিক্রি করছে একটি চক্র। এতে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সূত্র বলছে—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই সিলেট জোনে রয়েছে ৪০–৪৫ জন ডিলার। কিন্তু কারা এই ডিলার, তার কোনো তালিকা পাওয়া যায় না। অনেক ডিলার মারা গেছেন বা ব্যবসা ছেড়েছেন, তবুও তাদের নামেই চলছে গ্যাস বণ্টন। এই বিভ্রান্তির সুযোগেই গড়ে উঠেছে কালোবাজারি সিন্ডিকেট
ক্ষতিগ্রস্ত এক খুচরা ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন—“আমরা সরকারি গ্যাস পাই না। আর পাইলেও বোতলগুলো খুব পুরাতন ও লিকেজ থাকে। কাস্টমার নিতে চায় না। মাসে ১০–১৫টি বোতল পেলেও বেশিরভাগই ক্ষতিগ্রস্ত—ব্যবসায় লোকসান হয়।” তিনি আরও জানান—“কিছু অসৎ ব্যবসায়ী সরকারি গ্যাস বেসরকারি বোতলে ভরে ১২–১৩শ টাকায় বিক্রি করছে। ক্রসিং করতে গিয়ে বিস্ফোরণে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই।”
পদ্মা অয়েল কোম্পানী লি.–এর সিলেট জোনের সহকারী ব্যবস্থাপক (বিপণন) জানান—“আমাদের কোনো তথ্য দেওয়ার অনুমতি নেই। জানতে হলে চট্টগ্রাম অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।” ডিলারের সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান।
গ্যাস বিতরণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মের অভিযোগ জানতে চাইলে তিনি বলেন—“পদ্মা অয়েলের কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত নয়। বাজারে সরকারি গ্যাস নেই—এ কথাও সঠিক নয়।” তবে বাজার ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তার বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি।
অনেকেই বলছেন, সরকারি গ্যাস বাজারে না থাকা সরাসরি দুর্নীতি ও তদারকি ব্যর্থতার ফল। বেসরকারি বোতলে ক্রসিং করে বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় ও প্রাণঘাতী ঝুঁকিপূর্ণ। তছাড়া সরকারি গ্যাস সিলেট থেকে অন্য জেলায় পাচার হয়ে জালিয়াতি আরও সহজ এবং ডিলার তালিকা প্রকাশ না করা, তথ্য গোপন করা—সবই বড় অনিয়মের ইঙ্গিত
বাজার ঘুরে দেখা গেছে , কৈলাশটিলায় উৎপাদিত সরকারি এলপি গ্যাসের বোতল বাজারে নেই—তথ্যটি শুধু বাজারের অস্থিরতারই নয়, বরং একটি গভীর দুর্নীতি, অদক্ষতা ও সিন্ডিকেট–নিয়ন্ত্রিত বিতরণব্যবস্থার প্রমাণ। সরকারি গ্যাস জনগণ পাচ্ছে না—বরং কালোবাজারিরা পাচ্ছে বাড়তি লাভের সুযোগ।
এই অনিয়ম বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ না হলে বাজার অস্থিরতা আরও বাড়বে এবং গ্রাহকরা বেসরকারি গ্যাসের উচ্চমূল্যের দাসত্বেই আটকে থাকবেন।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: