প্রতিকূল আবহাওয়া ও শ্রমিক অসন্তোষ
চা-শিল্পে অশনিসংকেত, কমছে উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভাবনা
প্রতিকূল আবহাওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ, তীব্র খরা ও ভারী বৃষ্টিপাতের নেতিবাচক প্রভাবে দেশের চা-শিল্পে দেখা দিয়েছে গভীর সংকট। উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি বাণিজ্যেও ধস নামার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে চা-শিল্পে তৈরি হয়েছে অশনিসংকেত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে দেশে চায়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়—১০ কোটি ২৯ লাখ কেজির বেশি। ওই বছরই প্রথমবারের মতো দেশের চা উৎপাদন দুই অঙ্কের মাইলফলক অতিক্রম করে। তবে সদ্য বিদায়ী ২০২৪ সালে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন নেমে আসে ৯ কোটি ৩ লাখ ৪ হাজার কেজিতে। চলতি বছরও উৎপাদন কমেছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ।
চলতি বছর ১০ কোটি ৩ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অক্টোবর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৫ লাখ কেজির বেশি। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চা গাছে কুঁড়ি আসতে দেরি হওয়া, অনাবৃষ্টি ও পর্যাপ্ত সেচব্যবস্থার অভাব উৎপাদন ব্যাহত করেছে।
দেশের ১৭১টি ছোট-বড় চা-বাগানের মধ্যে ৯৩টিই মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। এখানকার বাগানগুলোতেই উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। আধুনিকায়ন ও নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক সংকটে উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না।
এদিকে উৎপাদন কমার পাশাপাশি নিলামে চায়ের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকার সর্বনিম্ন চায়ের দাম ২৪৫ টাকা নির্ধারণ করলেও নিলামে সেই দামে চা বিক্রি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। অবৈধ পথে নিম্নমানের চা দেশে প্রবেশ করায় দেশীয় চা-শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চা-শ্রমিক মনি গোয়ালা, নমিতা মাদ্রাজী ও স্মৃতি চাষা বলেন, চা পাতা কম হওয়ায় এ বছর তারা প্রত্যাশিত আয় করতে পারেননি। নির্ধারিত পরিমাণের বেশি পাতা তুলতে পারলে প্রতি কেজিতে অতিরিক্ত চার থেকে পাঁচ টাকা পাওয়া যায়, যা সংসার চালাতে সহায়ক হয়। কিন্তু উৎপাদন কম থাকায় সে সুযোগ মিলছে না।
শ্রীমঙ্গলের ক্লোনেল টি গার্ডেনের ম্যানেজার রনি ভৌমিক বলেন, সার, গ্যাস, ডিজেল ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। অথচ সে অনুযায়ী চায়ের দাম বাড়েনি। সরকার এ শিল্পের প্রতি নজর না দিলে ধীরে ধীরে এটি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে অনেক বাগান শ্রমিকদের মজুরি দিতে না পারায় বন্ধ হয়ে গেছে, আরও অনেক বাগান বন্ধের পথে।
বাংলাদেশীয় চা সংসদ সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান জিএম শিবলী বলেন, বছরের শুরুতে খরার কারণে অনেক চা গাছ নষ্ট হয়েছে। পর্যাপ্ত সেচব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল চা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি চেরাগ আলী মাস্টার বলেন, সরকার দাম বাড়ালেও নিলামে সে দামে চা বিক্রি হচ্ছে না, ফলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ন্যাশনাল টি কোম্পানির পরিচালক ও শ্রী গোবিন্দপুর চা-বাগানের স্বত্বাধিকারী মহসিন মিয়া মধু বলেন, পাশ্ববর্তী দেশ থেকে অবৈধভাবে নিম্নমানের চা প্রবেশ বন্ধ না করা গেলে দেশীয় চা-শিল্প আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শ্রীমঙ্গল টি ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএমএন মুনির বলেন, উৎপাদনের পাশাপাশি চায়ের গুণগত মান উন্নয়ন জরুরি। ভালো মানের চা উৎপাদন ও উন্নত প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে পারলে নিলামে চায়ের বিক্রি বাড়বে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: