মানব পাচারের অভিযোগে ছাতকের তিনজন নিখোঁজ

উদ্ধারে পরিবারের আকুতি

মানব পাচারের অভিযোগে ছাতকের তিনজন নিখোঁজ

উজ্জীবক সুজন তালুকদার, ছাতক প্রতিনিধি

০৮/০৯/২০২৬ ২২:২৭:০০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মানবপাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে ছাতকের ২  যুবক ও কোম্পানিগঞ্জের ১ যুবক নিখোঁজ রয়েছে। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সিংচাপইড় ইউনিয়নের সৈদেরগাঁও গ্রামের ২ যুবক ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার জালিয়ারপাড় গ্রামের ১ যুবক নিখোঁজ। তিনজনই কাশ্মীরে কাজের কথা বলে ভারতে যাওয়ার পর নিখোঁজ রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ না থাকায় স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

এ ঘটনায়  নিখোঁজদের স্বজনদের পক্ষ থেকে ছাতক থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টির তদন্তে নেমেছে  পুলিশ।

নিখোঁজ তিনজন হলেন—সৈদেরগাঁও গ্রামের মৃত মনোহর আলীর ছেলে সোহেল, একই গ্রামের মৃত রুসমত আলীর ছেলে আয়াছ আলী এবং জালিয়ারপাড় গ্রামের আনছার আলীর ছেলে আলা উদ্দিন। 

আলা উদ্দিন হলেন অভিযোগকারী মোছা.সামতেরা বেগমের জামাতা। অভিযোগকারী মোছা. সামতেরা বেগম (৬০), স্বামী মৃত মনোহর আলী, সৈদেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তার অভিযোগ, ফাহিম নামের এক ব্যক্তি ভালো বেতনে কাজ দেওয়ার কথা বলে সোহেল,আয়াছ আলী ও আলা উদ্দিনকে কাশ্মীরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ভারতে যাওয়ার পর প্রথমদিকে পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকলে ও একপর্যায়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

উঠে টাকা দাবির অভিযোগ, লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনজনের বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে ফাহিমের বাবা ফারুক পরিবারের কাছে প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। দেয়া হয়েছে  ১৫ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে।  উল্লেখ করা হয়েছে,পরবর্তীতে আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

অভিযোগকারী পক্ষের আরও দাবি, নিখোঁজ তিনজনকে আটকে রেখে তাদের মুক্তির বিনিময়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে এবং টাকা না দিলে তাদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগে উত্থাপিত এসব তথ্যের কোন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসবে। এ ব্যাপারে পুলিশের তৎপরতা রয়েছে  ফারুকের সন্ধানে এসআই মঞ্জু ঘটনার বিষয়ে জাউয়াবাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মোস্তফা কামাল বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়ে এসআই মঞ্জুকে ফারুকের সন্ধান নিতে দায়িত্ব দিয়েছি।”

এরপর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জাউয়াবাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই মঞ্জু বলেন, “ফারুকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। তাকে থানায় আসতে বলেছি, কিন্তু সে আসেনি। সে এলাকায় থাকে না। তার লোকেশন সিলেটের বাইরে।”

তিনি আরও বলেন, “সে জানায়, তার ছেলে ফাহিম ইন্ডিয়ায়। তাকে ও পাচ্ছে না। তবে ফারুকের নির্দিষ্ট সন্ধানের চেষ্টা করা অব্যাহত রয়েছে।”

ছাতক থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ঝলক মোহন্ত বলেন, দালাল এর পিতা  “ফারুকের সাথে কথা বলেছি। তার কথাবার্তার ধরণ ভালো না। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  একর্মকর্তা আরো জানান,অভিযোগের বিষয়ে ফারুকের অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং নিখোঁজ তিনজনের অবস্থান জানার চেষ্টা চলছে। ফাহিমের ভারতীয় নম্বরেও যোগাযোগ করে ব্যর্থ হওয়া গেছে।

নিখোঁজদের স্বজন ও পুলিশ  অনুসন্ধানের সময় ফাহিমের ভারতীয় মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

অন্যদিকে ফারুকের বক্তব্য, তার ছেলে ফাহিম ভারতে রয়েছে এবং ছেলের কাছ থেকে তিনি যে তথ্য পেয়েছেন, সেটিই জানিয়েছেন। বর্তমানে তিনিও ফাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না বলে দাবি করেছেন।একাধিক ফোনালাপ রেকর্ডে, তবুও মিলছে না নিখোঁজদের সন্ধান ঘটনাটি জানার পর এই প্রতিবেদক উজ্জীবক সুজন তালুকদার নিজ উদ্যোগে বিষয়টির অনুসন্ধান করেন। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ফারুকের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কথা বলা হয়েছে এবং এসব কথোপকথনের একাধিক রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।

কথোপকথনে ফারুকের পক্ষ থেকে নিখোঁজ তিনজন ভারতে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে থাকার কথা জানানো এবং তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়ার কথা উঠে আসে। 

তবে ওই পুলিশ ফাঁড়ির নির্দিষ্ট নাম, অবস্থান কিংবা ঠিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ও নিখোঁজ তিনজনের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। ফলে তারা বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, নিরাপদে আছেন কি না এবং তাদের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে—তা নিয়ে স্বজনদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

নিখোঁজ তিনজনের পরিবার দ্রুত  নিখোজদের  সন্ধান ও উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগসহ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে সোহেল, আয়াছ আলী ও আলা উদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সুনামগঞ্জ-৫, আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, বিষয়টিকে শুধু নিখোঁজের ঘটনা হিসেবে না দেখে মানব পাচারের অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। 

কেউ যদি প্রতারণা, পাচার, আটকে রাখা কিংবা মুক্তিপণের দাবির সঙ্গে জড়িত থাকে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে নিখোঁজ তিনজনকে দ্রুত উদ্ধারে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি উঠেছে। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad