বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রাসন রোধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের আহ্বান
হাওর ও পরিবেশ রক্ষায় বার্মিংহামে মতবিনিময় সভা
মৌলভীবাজারের হাওর, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি ও পরিবেশ রক্ষায় প্রবাসীদের সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা চেয়ে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাওর রক্ষা আন্দোলন মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সদস্যসচিব এম. খছরু চৌধুরীর আগমন উপলক্ষে কমেন্ট্রি রোডের পানসী রেস্তোরাঁয় স্থানীয় প্রবাসী ও কমিউনিটি নেতাদের উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।
বার্মিংহামের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর বখতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন কমিউনিটি নেতা নুরুল ইসলাম কিসলু, ইফতেখারুল হক পপলু, জয়নাল মিয়া, এনামুল হক, বাছিক মিয়া ও মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেকে।
সভায় হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্যসচিব এম. খছরু চৌধুরী বলেন, "মৌলভীবাজারের হাওর অঞ্চলগুলো আজ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির লোলুপ দৃষ্টিতে পড়েছে। পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই হাওরের সস্তামূল্যের কৃষিজমি কেনা ও সরকারি খাস জমি দখল করে শিল্পের নামে পরিবেশ ধ্বংসের পায়তারা চলছে। প্রাণ আরএফএল, ইসি হোল্ডিং ও ইসলাম এগ্রোর মতো কোম্পানিগুলো হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন ভঙ্গ করে নদী ও হাওরের জমি দখল করছে।"
তিনি আরও বলেন, "হাওরে অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা শিল্পায়ন হলে কৃষি ও মৎস্য পেশার সাথে যুক্ত ২৭ থেকে ৩৪ হাজার পরিবারের কর্মসংস্থান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতির পাশাপাশি ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষের মিঠাপানির মাছের জোগান এবং পাখির বিচরণক্ষেত্র পুরোপুরি বিনষ্ট হবে।"
সভায় বক্তারা জানান, হাওর রক্ষা আন্দোলনের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে হাকালুকি হাওরকে রক্ষা আদেশের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে এবং 'হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন' বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়েছে। খ্যাতনামা জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীসহ পরিবেশ সচেতন মানুষ এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত আছেন।
বক্তারা বলেন, পরিবেশ না হারিয়েও বিকল্প উপায়ে উন্নয়ন সম্ভব। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির জন্য হাওরের কৃষিজমি ভরাট না করে 'মনু সেচ প্রকল্প'-এর বাঁধসংলগ্ন প্রায় ৬৪ কিলোমিটার উন্মুক্ত জমি এবং প্রধান ও উপ-ক্যানেলের মধ্যবর্তী ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে পরিবেশ ও কৃষিজমি অক্ষুণ্ণ রেখেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব।
সভায় হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরে পেশ করা হাওর রক্ষা আন্দোলনের ১২ দফা দাবি গুরুত্বের সাথে তোলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে
১. সীমানা নির্ধারণ: মানব-বসতির সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের নামে হাওর সংকোচন বন্ধে হাওরের সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করা।
২. আইন বাস্তবায়ন ও সমীক্ষা: হাওরাঞ্চলে যেকোনো অবকাঠামো বা উন্নয়নমূলক কাজ করার আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা।
৩. সুরক্ষা আদেশ জারি: টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওরের আদলে 'কাউয়াডিঘি' ও 'হেইল হাওর' সুরক্ষা আদেশ জারি করা।
৪. নদীর নাব্যতা ও সংযোগ: ত্রিপুরা থেকে পানি প্রবাহ বন্ধ হওয়া হেইল হাওরকে বাঁচাতে 'মনু নদী-হেইল হাওর সংযোগ প্রকল্প' গ্রহণ ও নালা-ছড়া খনন করা।
৫. পলি অপসারণ ও মাটি রপ্তানি: হাওরের তলার পলি ড্রেজিং করে তা মধ্যপ্রাচ্য বা সিঙ্গাপুরে রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই করা।
৬. ইজারা প্রথা বাতিল: হাওরের বিল-খাল ইজারা দেওয়া বন্ধ করে প্রকৃত জেলেদের জন্য লাইসেন্স প্রথার মাধ্যমে মাছ আহরণের সুযোগ তৈরি।
৭. বিকল্প সৌরবিদ্যুৎ মডেল: কৃষি/জলাভূমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট না করে বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের (BIGD) প্রস্তাবিত মডেল অনুসরণ করা।
৮. মনু সেচ প্রকল্প সংস্কার: মনু সেচ প্রকল্পের ফিচ-পাস গেট বৃদ্ধি, সংরক্ষণাগার তৈরি এবং ধলাই নদীতে স্লুইস গেট নির্মাণ।
৯. পাকা রাস্তা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা: পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এমন রাস্তা নির্মাণ বন্ধ রাখা এবং হাওরে চলাচলের জন্য সাব-মার্জিবল রাস্তা ও খাল খনন।
১০. জলজ বন ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ: হিযল, করচ, জারুল গাছ রোপণ এবং শাপলা-শালুক ও প্রাকৃতিক শ্যাওলার বৈচিত্র্য রক্ষা করা।
১১. অবৈধ দখল উচ্ছেদ: ১৯৫৬ সালের রেকর্ড অনুযায়ী হাওরের খাস জমি উদ্ধার করা এবং কোম্পানিগুলোর অবৈধ ইজারা ও দখল বাতিল করা।
১২. পর্যটন নিয়ন্ত্রণ: শীত ও বর্ষাকালে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি।
আড্ডায় উপস্থিত প্রবাসী কমিউনিটি নেতারা হাওর রক্ষা আন্দোলনের দাবিসমূহের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় যুক্তরাজ্য থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থনের আশ্বাস দেন।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: