গল্প:
সাদা পাথরের কান্না
ভোরের কুয়াশা নদীর ওপর ভেসে আসছিল। রফিক ধলাই নদের তীরে দাঁড়িয়ে ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্টের দিকে তাকাল। জল অচেনা, মলিন, বাতাসে ধুলো, আর যতদূর চোখ যায়, খুঁড়ে নেওয়া গর্ত আর খানিকটা ধ্বংসপ্রাপ্ত পাথর ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না।
কয়েক মাস আগে এখানকার সাদা পাথরের ঝিকিমিকি, পাহাড়ের মেঘের আলিঙ্গন, নৌকায় ঘুরতে আসা পর্যটকরা—সবকিছু এখন শুধু স্মৃতিতে।
পরিবর্তন শুরু হয়েছিল ছয় মাস আগে। প্রথমে রাতের অন্ধকারে ট্রাকগুলো আসে, ভোরের আগে চলে যায়। পরে দিনে-দুপুরে, লোকজনের চোখের সামনে, লম্বা লাইন ধরে পাথর বোঝাই হয়।
একদিন চায়ের দোকানে কয়েকজন আলোচনা করছিল—
– “এই পাথর শুধু ট্রাকওয়ালার না, মেম্বার, চেয়ারম্যান ও নেতাদের ভাগে যাচ্ছে।”
– “উপর মহলও খাচ্ছে। না হলে প্রশাসন চুপ কেন?”
– “যদি কেউ বেশি কথা বলে, দেখে নিস মামলা খাবে।”
রফিকের হৃদয় ভারী হয়ে গেল। ব্যাপারটা শুধু চুরি নয়—এটা ক্ষমতা, অর্থ আর রাজনীতির খেলাও। রাজনীতির খেলা বড় কঠিন, এখানে সত্য লুকিয়ে রাখা হয়, ন্যায়বিচার দমিয়ে রাখা হয়।
দুপুরে সাহস করে রফিক সরকারী অফিসে গেল।
– “স্যার, সাদা পাথর শেষ হয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের সম্পদ। পর্যটনও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।”
অফিসের এক কর্মকর্তা কাগজে চোখ রেখে বলল,
– “এসব আমরা দেখব।”
– “কিন্তু স্যার—”
– “আপনার দেখার দরকার নেই। যান।”
কথাটা এমনভাবে বলা হলো, যেন রফিকের আসার অধিকারই নেই।
কয়েক সপ্তাহ পর গ্রামে ক্ষোভ ফেটে পড়ে। বাজারের পাশে একটি মাঠে লোকজন জড়ো হয়—জেলে, নৌকাচালক, দোকানি, রিকশাওয়ালা, কলেজ ছাত্র। সব মুখে একটাই প্রশ্ন—“আমরা চুপ থাকব কতদিন?” “আমরা ভেবেছিলাম রাস্তা বানালে পর্যটক আসবে, ব্যবসা বাড়বে। এখন সেই রাস্তা দিয়েই পাথর যাচ্ছে। " আমাদের প্রসাশন পাহারাদার না, ডাকাত!”
একজন বৃদ্ধ যোগ করল, “শুনেছি আমাদের নেতা আরও বড় নেতা নিয়ে এসেছিলেন, পাথরের পাশে ছবি তুলেছেন। তারপর? কিছুই হয়নি।”
জনতা গর্জে উঠল। কেউ বলল, “আমরা নিজেরাই পাহারা দেব।”
কিন্তু অন্যরা জানত, যারা পাথর তোলার পেছনে আছে, তাদের আছে টাকা, ক্ষমতা, অস্ত্র—সবই আছে। এই সব মিলিয়ে রাজনীতির খেলাকে করে তোলে বড় কঠিন, যেখানে সাধারণ মানুষ কেবল দর্শক।
রাতের অন্ধকারে রফিক ও কয়েকজন বন্ধু নদীর তীরে গেল। দূরে হেডলাইটের আলো, ট্রাকের শব্দ। তারা গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখল—পাথর তোলা হচ্ছে, পাশে এক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার লোকজন পাহারা দিচ্ছে।
রফিকের বন্ধু কণ্ঠ নিচু করে বলল, “আমরা যদি সবাই মিলে রাস্তায় ব্যারিকেড দিই?”
রফিক চুপ রইল। তার চোখ নদীর জলে—যেন নদী বলছে, “আমাকে রক্ষা করো, নইলে আমি চিরতরে চলে যাব।”
সেদিন রাতে গ্রামের কয়েকটি ঘরে আলো জ্বলল অনেক রাত পর্যন্ত। চুপচাপ কিছু পরিকল্পনা হলো—কেউ বলল, প্রতিবাদ মিছিল হবে, কেউ বলল, মিডিয়া ডাকা হবে, আর কেউ বলল, ব্যারিকেড ছাড়া কোনো উপায় নেই।
রফিক জানত, আগামী দিন ভয়ংকর হবে। কিন্তু যদি লড়াই না হয়, নদী, পাথর, সৌন্দর্য—সবই কেবল গল্প হয়ে যাবে। নদীর উপর ভেসে থাকা কুয়াশার ভেতর দিয়ে চাঁদের আলো পড়ল গর্তে ভরা জমির উপর। রফিক মনে মনে বলল-
"ইতিহাস যারা রক্ষা করে না, তারা ইতিহাসে বেঁচে থাকে না। আর যারা রাজনীতির খেলায় জনগণকে হারিয়ে দেয়, তাদের বিচার হয় সময়ের আদালতে।"
দুবাই, ১৩ আগস্ট ২০২৫।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: