নেপথ্যে রাজনৈতিক শক্তি
ধলাই নদীতে বালুখেকোদের বিধ্বংশী তান্ডব
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে বালুখেকো চক্রের তান্ডব চলছে বিরামহীন। এই আগ্রাসন আগেও ছিল। এখনও চলছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন যা চলছে, তা রীতিমতো মহোৎসব। যেকোন সময়ের চেয়ে বেড়েছে বালুর রাজ্যে আধিপত্য। এর ফলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ। এতে করে কয়েক বছরের মধ্যেই পর্যটন অঞ্চল নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিজিবি,প্রশাসন,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকলেও অভিযান অব্যাহত আছে-এমন বক্তব্যের বাহিরে কিছুই করার নেই তাদের। আগে এর নিয়ন্ত্রণ ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। গেল বছরের ৫ আগষ্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে বালু লুটপাটেও আসে পরিবর্তন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হাত বদল হলেও পা বদল হয় নি। এখন আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে না থাকলেও ভর করছে জাতীয়তাবাদী শক্তির উপর। ফলে দুই শক্তির অদৃশ্য মিলনে বালুর রাজ্যে চলছে বিধ্বংশীতাণ্ডব। এদের বিরুদ্ধে স্থানীয় পরিবেশবাদীরা দফায় দফায় মাঠে নেমেছে আন্দোলনে। কিন্তু চর্মচোখে রাজনৈতিক দুই শক্তির প্রকাশ্য রূপ এখন তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলনকারীদের জীবন জীবীকা এখন হুমকীর সম্মুখীন। আবার লুটের খেলায় ভিন্ন স্টাইলও রয়েছে। আগে এই লুটপাট ব্যবসায় জড়িত ছিলেন স্থানীয় উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি সাহাব উদ্দিন। কিন্তু গেল মাসে ধলাই নদীর বালু উত্তোলনে নতুন টেন্ডার পরবর্তী উপজেলা সভাপতি দর-দেনার মারপ্যাচে সুযোগ বঞ্চিত হন। ফলে স্থানীয়দের আন্দোলনে তিনিও সামিল হন প্রকাশ্যে। যে কারণে তিনি নিজ দলের যুবসংগঠনের নেতার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। আর এভাবেই সিলেট জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ মকসুদের নামটি চলে আসে প্রকাশ্যে। সোমবার (১১ আগষ্ট) ধলাই সেতু রক্ষা কমিটির ব্যানারে এক মানববন্ধন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ব্যানারে জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদের নাম উল্লেখপূর্বক তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অবিলম্বে সেতু রক্ষায় বালু লুটপাট বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আলমগীর আলম এবং পরিচালনা করেন মাস্টার নিজাম উদ্দিন।
এদিকে সমাবেশের ৫ ঘন্টার মধ্যে উপজেলার বিএনপি সভাপতি মো.সাহাব উদ্দিনকে কেন্দ্রের নির্দেশে দলীয় পদ থেকে স্থগিত হওয়ার ঘোষণা আসে। ১১ আগষ্ট দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে মো. সাহাব উদ্দিনের উপর চাঁদাবাজি, দখলবাজীসহ দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত থাকার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। স্থগিতাদেশের পর এর পিছনে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের হাত রয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন উঠে। উপজেলা বিএনপির শীর্ষ দুই নেতাও বিষয়টিকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন। তবে স্থগিতাদেশের পক্ষে নয় উপজেলা কমিটির বেশিরভাগ নেতৃবৃন্দ। ফলে দলীয় হাই কমান্ডের এই সিদ্বান্তে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা অসন্তোষের বিষয়টিও প্রতিবেদকের কাছে ব্যক্ত করা হয়।
যেভাবে লুটপাট শুরু
গেল আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত সিলেটের বালু ও পাথর কোয়ারি ইজারা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে স্থানীয় ভাবে জোড়ালো আন্দোলন হলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করে নি। অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও কোয়ারি ইজারার সিদ্বান্ত রয়ে গেছে পূর্বের মতোই। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত মাসে কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা পায় ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর নাম আবদুল্লাহ আল মামুন। আবদুল্লাহ আল মামুন-সম্পর্কে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আব্দুল ওয়াদুদ আলফু’র বায়রা ভাই। যিনি আওয়ামী লীগের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা শাখার সহ সভাপতি। ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের নামে ইজারা অনুমোদন হলেও মূলত টাকার সাপ্লাইয়ার আলফু চেয়ারম্যান। জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ মকসুদের তালতো ভাই হলেন কোয়ারির ইজারাদার আবদুল্লাহ আল-মামুিন। তবে কিভাবে এবং কোন সূত্রে তাদের এই আত্মীয়তা সেই সম্পর্কে কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সাংগঠনিক পরিচয়ে ভয়-ভীতি কাজ করায় আলফু চেয়ারম্যানের পরিকল্পনায় ব্যবসায় যুক্ত করা হয় জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ মকসুদকে। এর পর থেকেই ধলাই নদীর ইজারাস্থানে সারাক্ষণ উপস্থিতি থাকে ছাত্রদল ও যুবদলের। সাথে রয়েছে আলফু বাহিনীর সশস্ত্র টিম। মাঝে-মধ্যে সিলেট থেকে ধলাই অভিমুখে মহড়া চলে মোটর সাইকেল বহরের। সেখানে নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন ইউপি চেয়ারম্যান আলফু মিয়া। একইসাথে মকসুদের পক্ষে ইজারাস্থানে কাজী ইলিয়াস গ্রুপের রাসেলের উপস্থিতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এদিকে একসময়ের প্রবল পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান কাজী আব্দুল ওয়াদুদ আলফু’র বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি এলাকায় ২টি খুনের ১টির প্রধান আসামি। কোম্পানিগঞ্জেও একটি খুনের প্রধান আসামি। অস্ত্র ও মাদকসহ রেকর্ডভুক্ত ১৫টি মামলার আসামী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নিজের বন্দুক নিয়ে হামলার নেতৃত্বদাতা। তার সরকারে আমলে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন তিনি-এমন অভিযোগ স্থানীয় সূত্রের। তবুও ধরা ছোঁয়ার বাহিরে তিনি। স্থানীয় থানা পুলিশ এখনও কদর বা সম্মান করেন এই নেতাকে।
তবে মঙ্গলবার পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। না ছিল আলফু বাহিনী, না ছিল সারি সারি নৌকার বহর। সর্বত্র বিরাজ করছিল পিনপতন নীরবতা। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি নৌকায় ধলাই নদীর তীরে অবস্থান করলেও সেখানে নেই কোন শ্রমিক। গেল রোববার ও সোমবার সাদা পাথরের রাজ্যে পাথর লুটপাটের ঘটনার সংবাদ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গোটা কোম্পানীগঞ্জ ও ভোলাগঞ্জে অন্যরকম পরিস্থিতি বিরাজ করে। একই সাথে সদ্য দলীয় পদ থেকে স্থগিত হওয়া মো. সাহাব উদ্দিনের পক্ষের লোকজনের মধ্যে বিরাজ করছে প্রচণ্ড ক্ষোভ।
এ সময় স্থানীয়রা জানান, নদীর তলদেশ গর্ত করে বালু উত্তোলনের ফলে গতিপথ হারাচ্ছে ধলাই নদী। ব্রিজের নীচ থেকেও তোলা হচ্ছে বালু ।ফলে অস্থিত্ব সঙ্কটে রয়েছে ধলাই ব্রিজ। প্রতিদিন অন্তত একশো থেকে দেড়শো নৌকা করে ধলাই নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হয়-এমনটি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বালু থেকে দৈনিক টাকা আদায়ের পরিমান কেমন-এমন প্রশ্নের আসল পরিমান না জানা গেলেও স্থানীয় একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘এর পরিমান দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা হতে পারে।’ সাথে যোগ করে তিনি বলেন, এই টাকায় ভাগ রয়েছে বিভিন্ন জনের। এর একটি অংশ প্রশাসনের জন্য বরাদ্ধ। বাকি বরাদ্ধদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সংবাদকর্মীসহ জাতীয়তাবাদী দলের অঙ্গ সংগঠন সমুহের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। আবার দলের নির্বাহী কমিটিতেও যায় একটি ভাগ। ধলাই ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার একজন বাসিন্দা ভয়ে নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেন্দ্রীয় যুবদলের একজন প্রথম সারির নেতার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বিএনপির একজন নেতাও পাথররাজ্যের সূবিধাভোগী। তাঁর মতে, জেলা বিএনপিও পাথররাজ্যে বালু লুটপাটে ভাগ-বাটোয়ারার বিষয়টি অবগত। ফলে জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতি নিয়ে কেউই মাথা ঘামাতে পারছে না।
বালুখেকোদের হাত থেকে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই সেতু রক্ষায় সভা ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনও বালুখেকোদের হাত থেকে ধলাই সেতু রক্ষায় আন্দোলনের মাঠে নামে। পৃথক পৃথক অনুষ্ঠিত এই সব সভা থেকে বালু লুটতরাজ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। প্রশাসনকে দুইদিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয় সভা থেকে। এর মধ্যে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন বক্তারা। কিন্তু আন্দোলনের ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও ঘুম ভাঙেনি প্রশাসনের। উপরন্তু হুমকী মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।
অভিযোগের বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মো. সাহাব উদ্দিন (১০ আগষ্ট রোববার) বলেন, ধলাই সেতু রক্ষায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি থেকে বালু লুটতরাজ বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের ভূমিকা নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তিনি জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদকের নাম উল্লেখ করে স্পষ্টভাবে বলেন, জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রভাব থাকায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসররা প্রকাশ্যে আজ পাথররাজ্যে তান্ডব চালাচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য জেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদকের ওয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে ম্যাসেজ দিলেও সাড়া পাওয়া যায় নি।
পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের অন্যতম সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, এক বছরে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানসমূহ সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এর দায় খনিজ সম্পদ ও পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে। পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অতীতে সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ, শ্রীপুর, লোভাছড়া এলাকার পাথর লুণ্ঠন বন্ধে কী করতে হবে সে-সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান করতেন, আইনি লড়াই করতেন। সভা-সেমিনারে প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় অনেক কথাই বলতেন কিন্তু সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদ উনার দায়িত্ব পালনকালে বিনাশ হয়ে যাওয়ার ব্যর্থতায় একজন পরিবেশকর্মী হিসাবে ব্যথিত ও বিব্রত।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি উজায়ের আল মাহমুদ আদনান বলেন, বালুপাথরকে কেন্দ্র করে ১৫টি মামলা হয়েছে। ৭০ জনের মতো আসামি গ্রেপ্তারও হয়েছে। স্থানীয়ভাবে লুটপাট ঠেকাতে বড় অভিযানের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এ ধরনের লুটপাট হয়েছে। প্রশাসনের উচিত ছিল আরও আগে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। সচেতন নাগরিকদেরও এ ব্যাপারে আরো স্বোচ্ছার হতে হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এর সাথে জড়িত।
এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, বালুপাথরে লুটপাট বন্ধে প্রশাসন সর্ব্বোচ্চ কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই অভিযান হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: