সুনামগঞ্জে যখন প্রথম 'কারেন্ট' এলো

সুনামগঞ্জে যখন প্রথম 'কারেন্ট' এলো

স্বপন কুমার দেব

১২/০৭/২০২৬ ২০:৪২:৪৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জ শহরে প্রথম ইলেকট্রিসিটি বা বিদ্যুৎ এসেছিল আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে। আজকালকার মতো বিদ্যুৎ তখন সঙ্গে করে একরাশ বিরক্তির লোডশেডিং নিয়ে আসত না।


আমি তখন স্কুলে পড়ি। সন্ধ্যা নামলেই চারপাশে এক মায়াবী অন্ধকার ঘনিয়ে আসত। অমাবস্যায় নিশ্ছিদ্র কালো আঁধার, আর পূর্ণিমায় রূপালী চাঁদের আলোয় ভেসে যেত চেনা শহরটা। ঝোপঝাড়ে জ্বলত জোনাকি পোকার নীলচে আলোর মেলা। মোড়ের ল্যাম্পপোস্টগুলোতে জ্বলত কেরাসিন তেলের বাতি, বিশেষ বিশেষ দিনে হয়তো মাঝে মাঝে পেট্রোম্যাক্স বা হ্যাজাক বাতির দেখা মিলত। আর আমাদের চেনা ঘরদোর, চিরচেনা দোকানপাটে টিমটিম করে জ্বলত লণ্ঠন, হারিকেন কিংবা কুপি বাতি। বড় বড় কিছু দোকানে পেট্রোম্যাক্স জ্বালানো হতো।


সন্ধ্যার পর বড়দের বাইরে বের হওয়ার চিরসঙ্গী ছিল দুই ব্যাটারির এভারইডি টর্চ। কোনো উৎসব-পার্বণে মহিলারা যখন দল বেঁধে এক বাসা থেকে অন্য বাসায় বেড়াতে যেতেন, তখন তাঁদের আগে আগে লণ্ঠন হাতে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত বাড়ির কোনো বিশ্বস্ত কাজের লোক। আঁধারমাখা সেই মায়াময় সময়ে শহরের বিশিষ্ট মানুষেরা উদ্যোগী হলেন সুনামগঞ্জে আলো আনার।


এই মহৎ উদ্দেশ্যে প্রথমেই গঠিত হলো ‘ইলেকট্রিক কো-অপারেটিভ সোসাইটি’। সোসাইটির দূরদর্শী সভাপতি হলেন শ্রদ্ধেয় দেওয়ান ওবেয়াদুর রেজা চৌধুরী সাহেব। আর তৎকালীন এসডিও প্রশাসন থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আবিদ সাহেব এই কাজে অকুন্ঠ সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন। শহরের সামর্থ্যবান মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করে গড়ে তোলা হলো তহবিল। এরপর ঢাকা থেকে কেনা হলো একটি বিশাল আকৃতির জেনারেটর বা ডায়নামা। পাওয়ার হাউসটি যেখানে ছিল, আজ এত বছর পরেও সেটি সেখানেই আছে; তবে তখনকার সেই খোলামেলা পরিবেশটা আর নেই। গড়ে উঠেছে পাকাপোক্ত ইঞ্জিন রুম। স্থানীয় তরুণদের নিয়োগ দিয়ে তাঁদের যথাযথ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।


তবে সেই বিশাল ডায়নামাটি ফিট করার জন্য সুদূর পশ্চিম জার্মানি থেকে আনা হয়েছিল একজন তরুণ ইঞ্জিনিয়ারকে। দেওয়ান ওবেয়াদুর রেজা সাহেব তাঁর অসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে এই পুরো কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেন। উনার ব্যক্তিত্ব কেমন ছিল, তা পরে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়েও দেখেছি। এমএনএ হিসেবে বালাট বা শিলং শহরে যখন ডিএম কিংবা এসপিদের সাথে কথা বলতেন, তারা উনার ব্যক্তিত্বের কারণে উনাকে দারুণ সমীহ করত।


যাই হোক, জার্মানি থেকে আসা সেই তরুণ ইঞ্জিনিয়ার শহরে পা রেখেই কাজ শুরু করে দিলেন। ধবধবে ফর্সা, রোদে পুড়ে গায়ের রং যেন লাল টুকটুকে। পাওয়ার হাউসের পাশে একটা আলাদা তাঁবুতে থাকতেন তিনি। আমাদের দেশের ভ্যাপসা গরম সহ্য করতে না পেরে রোজ বিকেলে হাফপ্যান্ট আর রঙিন স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে খোলা চত্বরে এসে বসতেন। আর শহরের উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যেত বিদেশী সেই ‘সাহেব’ আর তাঁর কাজ দেখার জন্য। ভাষার প্রাচীরের কারণে কথা বলার সুযোগ ছিল না, কিন্তু আমরা ছোটরা দল বেঁধে প্রায়ই দূর থেকে হা করে সেই দৃশ্য দেখতাম। রোজ বিকেলে দেওয়ান ওবেয়াদুর রেজা সাহেব আসতেন কাজ পরিদর্শনে। তখন সাহেবের সাথে উনার চমৎকার ইংরেজিতে টুকটাক কথাবার্তা হতো।


শহরে কারেন্ট আসবে বলে ইতিমধ্যে অনেক বাসাবাড়িতে কাঠের বেটনে তার বসানো, ক্লিপিং করা, সুইচ-সকেট ফিট করার ধুম পড়ে গেল। যারা ট্রেনিং নিয়েছিলেন, তাঁরা তো ছিলেনই, পাশাপাশি বাইরে থেকেও অনেক দক্ষ কারিগর এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ‘সুভাষ বাবু’র কথা আজো খুব মনে পড়ে—সম্ভবত চট্টগ্রামের লোক ছিলেন, ভীষণ কর্মঠ আর আন্তরিক।


অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই শুভদিন, শুভক্ষণটি এলো। কিন্তু বিধি বাম! জেনারেটর আর স্টার্ট নেয় না। জার্মানির সেই তরুণ ইঞ্জিনিয়ার গরমে-উদ্বেগে ঘেমে নেয়ে একাকার, কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও ডায়নামা সচল করা যাচ্ছে না। উপস্থিত সবার মুখে তখন চিন্তার কালো ছায়া। ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন সুনীতি বাবু, আমাদের মৌলভীবাজারের অত্যন্ত দক্ষ একজন ফোরম্যান। তিনি জার্মান ইঞ্জিনিয়ারের অনুমতি নিয়ে ডায়নামার নিচের দিকে নেমে গেলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আবিষ্কার করলেন, একটি নাট-বল্টু ঠিকমতো বসেনি। সুনীতি বাবু চটপট নাটটি যথাস্থানে বসিয়ে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে কষে টাইট দিয়ে ওপরে চলে এলেন।


তারপর যেই না হ্যান্ডেল ঘোরানো—সাথে সাথে ‘ভট ভট’ শব্দে গর্জে উঠল সেই দানবীয় ডায়নামা! চারপাশ আলো করে জ্বলে উঠল বিজলি বাতি। মুহূর্তের মধ্যে করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। শুরু হলো সুনামগঞ্জের ইতিহাসে এক নতুন আলোকোজ্জ্বল যুগ।


প্রথম প্রথম এই ডায়নামা চালানো হতো সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। বহুদূর থেকে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসত সেই ‘ভটভট’ আওয়াজ, যা আমাদের কানে ছিল এক চেনা সুরের মতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর সুনামগঞ্জ যুক্ত হয় জাতীয় গ্রিড লাইনের মহোৎসবে। আর আমাদের শৈশবের সেই ঐতিহাসিক ডায়নামাটি সম্ভবত চলে যায় দিরাইয়ে, সেখানে নতুন আলোর মশাল জ্বালতে।


ডায়নামাটি চলে গেছে, দিনগুলোও বদলে গেছে, কিন্তু সুনামগঞ্জের আকাশে প্রথম বিজলি বাতি জ্বলে ওঠার সেই রোমাঞ্চ আজো স্মৃতির মণিকোঠায় অম্লান হয়ে আছে।

সুনামগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবী স্বপন কুমার দেব  

লেখক 

স্বপন কুমার দেব 

কানাডা প্রবাসী, সিনিয়র আইনজীবী

ডিডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad