গণ অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি
প্রত্যাশা-প্রাপ্তির খতিয়ান উঠে এসেছে আলোচনায়
কোটা সংস্কার নিয়ে গেল বছরের জুলাই মাসে শুরু হয় একটি আন্দোলন। আন্দোলনে অংশ নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কোটা সংস্কার আন্দোলন ক্রমশ দানা বেঁধে উঠে সর্বত্র। আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এরপর কোটা সংস্কার থেকে গড়ে উঠে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম। আন্দোলন তখন আরো তীব্র হয়ে উঠে। ছাত্রদের এই দাবি পূরণে সরকার এগিয়ে আসে নি। উপরন্তু আন্দোলন দমিয়ে রাখতে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে সরকার আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। সারাদেশে পুলিশী দমন পীড়নের বিপরীতে শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দেয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। শুরুর দিকে প্রকাশ্যে দলগুলো না থাকলেও আন্দোলনের তীব্রতায় আরও সোচ্চার হয়ে উঠে রাজনৈতিক দলগুলো। ১৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের তীব্রতা জুলাইয়ের শেষ দিকে দাবানল হয়ে উঠে। জ্বলতে থাকে সারাদেশ। একদিকে ভাঙচুর অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষণ। সবকিছু মিলিয়ে জুলাই হয়ে উঠে এক জ্বলন্ত আগ্নেগিরি। আন্দোলনে আবরোধ,হরতাল,সহিংসতা, বাস ধর্মঘট জনজীবনে এক চরম ভোগান্তি ঢেকে আনে। বাসা-বাড়িতে আবস্থান করা মানুষও যেন অজানা আতঙ্কে প্রহর গুনতে থাকেন।
একদিকে আন্দ্লোনের তীব্রতা আপরদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষন। সাথে যুক্ত হয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ,ছাত্রলীগসহ সরকার সমর্থিত সকল সংগঠনের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উপর অনাচার ও নিপীড়ন।
অভ্যুত্থানের বছর পূর্তি হলেও আন্দোলনকালীন নিহতের সংখ্যা এখনও সঠিকভাবে নির্নয় করা হয় নি। তবে ধারণা করা হয় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজারের উপরে। আহতের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারেরও অধিক। এখনও চিকিৎসাধীন অনেকেই কাতরাচ্ছেন হাসপাতালে। এই অবস্থায় চলমান আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়। এক দফার আন্দ্লোনে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলকে দু:শাসন,স্বৈরাচারি ও ফ্যাসিবাদ উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের সাথে প্রকাশ্যে মাঠে নামে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল। শুরু হয় যুগপৎ আন্দোলন। আন্দোলনকর্মীদের উপর সহিংসতার ফলে তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে দুই দিনব্যাপী রাজধানী ঢাকায় পরিচালিত হয় লং মার্চ। লং মার্চে সারাদেশ থেকে ঢাকামুখী ঢল নামে মানুষের। শুরু হয় গণভবনমুখী বিক্ষুব্ধ মানুষের পদযাত্রা। অবস্থা বেগতিক থেকে সেনা প্রধানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগে বাধ্য হন। এর মধ্য দিয়ে তার দলের ১৫ বছরের শাসনকালের অবসান ঘটে।
চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দায়িত্ব গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি উল্লেখ করেন। ৮ আগষ্ট দেশের চলমান সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ছাত্রদের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নোবেল বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুসের নের্তৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকার দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট সরকার পতনের একবছর আজ অতিক্রান্ত। ৫ আগষ্ট এখন গণ অভ্যুত্থান দিবস। এইদিন ছিল সরকারি ছুটির দিন। সারাদেশে দিবসটি পালিত হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশে। দেশের দায়িত্বে এখন অন্তর্র্বতীকালীন সরকার। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই এই সরকারের কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। সরকার এখন দায়িত্ব পালনের এক বছরের পথে। এখন হিসেব নিকেষের পালা। দেশের মানুষ অভ্যুত্থানের স্পিরিড থেকে কতোটুকু পেয়েছে কিংবা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন নাম ধারণ করে বিজয়ীরা আজ কতোটুকু বৈষম্যমুক্তির ঢেঁকুর তোলতে পেরেছেন। এসব বিষয় নিয়ে প্রথম সিলেট.কম কথা বলেছে, বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের সাথে। তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ষোলোকলা।
‘সবার প্রত্যাশা গুড়ে বালি’
জান্নাত আরা খানা পান্না
সহযোগী অধ্যাপক
গোবিন্দগঞ্জ আবদুল হক স্মৃতি কলেজ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটা অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল কোটা আন্দোলন কে কেন্দ্র করে। যেখানে আমি ও একাত্ম ছিলাম। কোটা আন্দোলনে সফলতা আসল কিন্তু আন্দোলন থামল না। আন্দোলন মোড় নিল এক দফায়। ফ্যাসিস্ট সরকারের পদত্যাগের দাবিতে। অর্থাৎ শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে।এটি ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন। এ আন্দোলনে ও সফলতা আসল ৫ ই আগস্ট ২০২৪। তখন সবার একটা প্রত্যাশা ছিল হয়তো নতুন কিছু হবে। এবার কেয়ার টেকার গভর্ণমেন্ট আসবে। একটা সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন নির্বাচন হবে। আর নির্বাচন হওয়ার আগ পর্যন্থ হয়তো দেশ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগের চেয়ে উত্তম শাসন ব্যবস্থায় দেশ পরিচালিত হবে। কিন্তু সবার প্রত্যাশা গুড়ে বালি করে দেশে হত্যা, ধর্ষণ,দূর্নীতি, চাঁদাবাজি,মব জাস্টিস ভয়াবহ রূপ নিল।শুরু হল মধ্যযুগীয় বর্বরতা।দখলদার বাহিনীর দৌরাত্ম। বিগত এক বৎসরে শুধু প্রত্যাশা ছাইচাপা নয় সাধারণ জনগণের মনে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সুখের প্রত্যাশা শোকের কালোছায়ায় ঢাকা পড়েছে। যা জনগণের মনে পতিত রাজনৈতিক সংগঠনকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক করে ফেলেছে।
‘মৌলবাদীদের আস্ফালনের উলম্ফন ঘটেছে’
মোহাম্মদ মনির উদ্দিন
আইনজীবী
জজ কোর্ট, সিলেট
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সাধারণ জনমানুষ সংঘটিত করেছিল। জনমানুষের প্রত্যাশা ছিল- বৈষম্য হ্রাস পাবে, দুর্দশা-দুর্নীতি কমবে, জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে। পাশাপাশি মানুষের বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। অন্তর্র্বতী সরকারের কাছে সেটাই ছিলো মানুষের প্রত্যাশা। কার্যত বছর ঘুরে আসলেও, তা-বাস্তবজীবনে মোটাদাগে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি বা প্রত্যাশার আদৌ কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থাপনা ও অবনতি দৃষ্টিগোচর হয়েছে। মৌলবাদীদের আস্ফালনের উলম্ফন ঘটেছে। মোটকথা,ব্যবস্তার বদল না-করে শুধুমাত্র শাসক বদল করে সার্বিক কোনো লাভ নেই। অনির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র যথাযথভাবে চালাতে পারে না, যার বহিঃপ্রকাশ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের দুর্বলতার কারণে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাদের প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে মবসন্ত্রাস ও সংকটের দিকে দেশ নিপতিত হচ্ছে। যা গণঅভ্যুত্থানের আকাংখার সাথে কোনোভাবেই যায় না। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার এর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ফলে কালক্ষেপণ না করে, যত দ্রুত সম্ভব একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা উচিত। বস্তুত অন্তর্র্বতী সরকারের কাছে এর চেয়ে বেশি চাওয়ার নেই, বড়ো কিছু প্রাপ্তিরও নেই। যা চাওয়ার তা- হচ্ছে একটি প্রত্যাশিত নির্বাচন দিয়ে তাড়াতাড়ি অন্তর্র্বতী সরকারের বিদায় হওয়া। তবে নির্বাচিত সরকারের কাছে অনেক প্রত্যাশা রয়েছে।
‘প্রাপ্তির হিসেবে হোচট খেতে হয়’
তারেক আহমদ খান
দপ্তর সম্পাদক
সিলেট মহানগর বিএনপি
প্রত্যাশা তো অবশ্যই অনেক অনেক বেশি ছিল। কিন্তু প্রাপ্তির হিসেবে হোচট খেতে হয়। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে মানুষ দিবসটি গুরুত্বের সাথে উদযাপন করলেও সবার মনে হতাশার আগুন জ্বলছে। ন্যায়বিচার, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন ছিল সকলের প্রত্যাশিত। শোষণ ও দমননীতির অবসান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, আর মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা। কিন্তু বাস্তবে প্রাপ্তি নেই উপরন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় স্বার্থসর্বস্বতা এবং সামাজিক বিভাজন এখনো রয়ে গেছে। যদিও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলেছে, তা প্রত্যাশার তুলনায় অপ্রতুল। তাই বর্ষপূর্তির এই মুহূর্তে প্রশ্ন থেকেই যায়, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা কি আমরা সত্যিই পূর্ণতা দিতে পেরেছি ?
‘মানুষ মত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছে’
গুলজার আহমদ হেলাল
সভাপতি
সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, কথা বলার অধিকার, যা ইতোমধ্যে আমরা পেয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল শহীদ আবু সাঈদ, সাংবাদিক এটিএম তুরাবসহ দুই হাজারের অধিক মানুষের খুনের বিচার, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার,পুনর্গঠন এবং দুর্নীতির মুলোৎপাটন করা। যা এখনো কাংখিত ও প্রত্যাশিত মানে পৌঁছে নি। জুলাই ঘোষণা পত্র এই সময়ে কার্যকর হয়ে যাওয়ার কথা ছিল । তা সবেমাত্র ঘোষণা হয়েছে। আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন পুরোপুরি হয়নি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল জাতীয় ঐক্যের এবং উৎসবমুখর পরিবেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আমাদের বড় প্রাপ্তির মধ্যে আরেকটি হলো স্বাধীনভাবে যে কোন কাজ করতে পারা। সর্বোপরি দেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং সুযোগের সমতা নিশ্চিত করে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই বৈষম্যহীন সমাজ ও নতুন বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হবে বলে আমি মনে করি।
‘জুলাই অভ্যুত্থান এক গৌরবময় অধ্যায়’
প্রকৌশলী আদনান তায়্যিব
যুগ্ম সমন্বয়কারী
জাতীয় নাগরিক পার্টি - এনসিপি, সিলেট মহানগর
জুলাই গণ অভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়, যেখানে আপামর ছাত্র-জনতার সাহসিকতা ও সচেতনতার অভাবনীয় প্রকাশ ঘটেছিল। প্রত্যাশা ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান। যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের সেবক, শাসক নয়। কিন্তু প্রাপ্তি বললে, সেই স্বপ্ন অনেকাংশে অপূর্ণই রয়ে গেছে। শাসনপ্রণালীর রূপ বদলালেও শোষণের চিত্র বদলায়নি। আজও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে রাজপথে দাঁড়াতে হয় আমাদের। তাই এই দিন শুধু উদযাপনের নয়, আত্মসমালোচনারও। পরিবর্তনের যে আলো জ্বলেছিল, তাকে কার্যকর বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার দায় এখনো রয়ে গেছে আমাদের কাঁধে।
‘দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার এখনও বিদ্যমান’
আনোয়ার শাহজাহান
সম্পাদক, আমাদের প্রতিদিন
ও
সভাপতি, ইউকে বাংলা অনলাইন প্রেসক্লাব
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা, অবিচার ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের এক তীব্র প্রতিবাদ। ফুঁসে ওঠা গণমানুষের সেই অভ্যুত্থান অনেক কিছু অর্জনের পথও তৈরি করেছিল। একনায়কতান্ত্রিক ধারার পতন ঘটে, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নতুনভাবে শুরু হয়, এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও হয়।
কিন্তু প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে আজকের প্রাপ্তি আমাদের কেবল হতাশ করে। আগে ’৭১-কে পুঁজি করে একটি দল নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ছিল মরিয়া। ঠিক তেমনি, ’২৪-এর অভ্যুত্থানকেও ফেরি করার ধান্ধায় ব্যস্ত একটি গোষ্ঠী। এই অবস্থা দেশের এবং গণতন্ত্রের জন্য কখনোই সহায়ক নয়, বরং পুরনো ধারায় ফিরে যাওয়ার অশুভ ইঙ্গিত। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয়করণ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বিদ্যমান।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, দেশের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতাদের ওপর নির্ভর করে না,জনগণই চূড়ান্ত শক্তি। এ শিক্ষা সকল রাজনৈতিক দলের নেওয়া উচিত। জুলাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়: গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না। তা অব্যাহত রাখতে হয় প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে।
‘কোন সূচকেই সরকারকে পাস মার্ক দেয়ার সুযোগ নেই’
আব্দুল করিম কিম
সমন্বয়ক
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন
আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি, দুঃশাসন, নিপীড়ন, নির্যাতন ও মিথ্যাচার দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে ব্যস্ত ছিল। ফলে টানা ১৫ বছরের শাসন ব্যবস্তায় ব্যবসায়ী, আমলা, দালাল বুদ্ধিজীবী ও নিপীড়ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়। গণ অভ্যুত্থানের মুখে জনবিচ্ছিন্ন সেই সরকারের পতন ঘটে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট। দু:শাসন পতনের বর্ষপূর্তি হয়েছে। একই সাথে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের হয়েছে এক বছর।
অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস। পূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে ইউনুস সাহেব শুরুতেই বিড়াল মারবেন। কিন্তু তিনি প্রথম রাতেই আত্বপরিচয়ের সংকটে থাকা তরুণ আন্দোলনকারীদের নিয়োগ পাওয়া শাসক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে নিজের আত্মপরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন।
মানুষের প্রত্যাশা ছিল ধ্বসে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তিনি দ্রুত উন্নয়ন করবেন। দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোরতা প্রদর্শন করবেন। ফ্যাসিষ্ট সরকারের রাঘর বোয়ালদের আটক করবেন. ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করবেন। দেশে উগ্রবাদের বাড়বাড়ন্ত নিয়ন্ত্রণে প্রগতিশীল ও আধুনিক চিন্তার মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। কিন্তু তিনি তা করতে পারেননি।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নেয়া শপথ ভঙ্গ করে কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি বা বাক্তি বিশেষের প্রতি অনুরাগ বা বিরাগ প্রদর্শন বিরত থাকবেন-এমন প্রত্যাশা থাকলেও তিনি শপথ রাখতে পারেননি। সরকারী সহযোগিতা দিয়ে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনে সহযোগিতা করছেন।
প্রত্যাশা ছিল-শান্তিতে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে নিজের অর্জিত মর্যাদাকে তিনি আরো মহীয়ান করবেন। তাঁর শাসনামলে সংখ্যালঘু ও বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ মর্যাদার সাথে নিজেদের নিরাপদ মনে করবে। কিন্তু এমনটি কি দেখা গেছে?
তাই এক বছরের প্রাপ্তির হিসাব নিকাশ শেষে আমার মুল্যায়ন হচ্ছে - অন্তর্র্বতীকালীন সরকার বিগত এক বছরে নজিরবিহীন ব্যর্থতা প্রদর্শন করে জাতিকে হতাশ করেছে। এই এক বছরে কোন সূচকেই তাদেরকে পাস মার্ক দেয়ার সুযোগ নেই।
‘ঐকমত্যের বদলে বিভাজন ও সংকীর্ণতার প্রসার ঘটেছে’
ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন
সম্পাদক
প্রথম আলো
উত্তর আমেরিকা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে জনগণের প্রত্যাশা ছিল গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তরের একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য গঠনের বদলে আমরা বরং বিভাজন ও দলীয় সংকীর্ণতার প্রসার ঘটতে দেখছি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঐক্য ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিভক্ত রাজনীতি আর একেক পক্ষের অনড় অবস্থান নিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
সাধারণ মানুষ বারবার প্রতারিত হয়েছে।তাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার ভিত্তিতে একটি সাম্যভিত্তিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা ছিল মূল প্রত্যাশা। গণতন্ত্র সবসময়ই নানা চ্যালেঞ্জ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগোয়। এসব পরীক্ষার মূল্য জাতিকে দিতে হয়। আমরাও দিয়েছি, এখনো দিচ্ছি।
ইতিহাস কখনো পিছনে হাঁটে না। সামনে ধাবমান বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিভেদ ও বিতর্কে ডুবে থাকবে, না কি অন্তত ন্যূনতম বিষয়ে ঐক্য গড়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবে। এটাই আজকের সময়ের বাস্তব ও চলমান প্রত্যাশা।
‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি’
আবু জাফর
আহ্বায়ক
বাসদ, সিলেট জেলা
বৈষম্যমূলক সমাজের আকাঙ্খাকে বুকে ধারণ করে প্রায় দেড় হাজার শহিদী আত্মদানে গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হলো। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটাতে পারলেও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে ১ বছর পূর্তিতে এসে আমরা দেখছি বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটতে চলেছে। শহিদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে অন্তর্র্বতী সরকার গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বিপরীতে হাঁটছে। এখনো গণহত্যাকারীদের বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজো হয়নি। আহতদের চিকিৎসা ও নিহত-আহতদের পরিবারের পুনর্বাসন হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন আয়ের মানুষেরা দিশেহারা। নতুন কর্মসংস্থান তো হয়নি, বরঞ্চ শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে নতুন নতুন বেকার হচ্ছে। সারাদেশে চাঁদাবাজি, তোলাবাজি, মব সৃষ্টি করে হামলা ও হত্যা, নারীর সাথে অসম্মানজনক আচরণ, মোরাল পুলিশিং, ধর্ষণ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, মাজার-বাউল আখড়া ভাঙা, নারীদের ফুটবল খেলায় বাধা, পত্রিকা-টিভিসহ প্রতিষ্ঠান-স্থাপনা দখল, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ভাঙচুর, দুর্নীতি-লুটপাট ইত্যাদি অব্যাহত রয়েছে। সরকারের প্রশ্রয়ে থাকায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে মব সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। ফলে দ্বিগুন উৎসাহে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
'৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে ’৪৭ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে মহলবিশেষ নানা কৌশল অবলম্বন করছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত ’৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতি বাতিলের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। নতুন বন্দোবস্তের নামে নব্য ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
১০.
‘বৈষম্য এখন মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে’
মিফতাহ্ সিদ্দিকী
সহ সাংগঠনিক সম্পাদক
জাতীয় নির্বাহী কমিটি
বিএনপি
স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল গণ-মানুষের। আর ছাত্রদের ছিল কোটাসংস্কার আন্দোলন। সুতরাং ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর মধ্য দিয়ে গণমানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু আজ বছর শেষে আমাদের অর্জনের হিসেব খুবই উদ্বেগের ও হতাশার। বৈষম্যমুক্তির বাংলাদেশে বৈষম্য এখন মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। একটি দলই রাষ্ট্র চালাতে মরিয়া। দুর্নীতি লুটপাট আগের চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপে দেখা দিয়েছে। এতোগুলো তাজাপ্রাণ যেন মূল্যহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদেশের মানুষ ৫২ তে প্রাণ দিয়েছে বাক স্বাধীনতার জন্য, ৭১ এ রক্ত দিয়েছে স্বাধীনতার জন্য, ৯০ এর আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু সবগুলো রক্তই আজ আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে। কারণ-আমরা তাদের প্রত্যাশা পুরণ করতে পারি নি। এখন আর রক্তপাতে বাংলাদেশ নয়। একটি গনতান্ত্রিক,বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত এবং কল্যানকামী রাষ্ট্র চাই। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রত্যাশাও ছিল তাই। সুতরাং অন্তর্র্বতীকালীন সরকার একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রদানের মাধ্যমে দ্রুত দেশকে গনতান্ত্রিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনবেন-সেটিই প্রত্যাশা। একই সাথে জুলাই-আগস্টে যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে। বাংলাদেশের সৃষ্টির পর থেকে আমরা যেই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, আমরা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ব, আমরা সেই রাষ্ট্র গড়তে পার নি। একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিগত দিনে আমরা দেখলাম একদিকে সম্পদের পাহাড় গড়া হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংক লোটপাট হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর এখন আমরা সকল মানুষকে নিয়ে আগামীর সুন্দর দেশ গড়তে পারি, এটাই হোক আমাদের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: