দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান
শুরু হলো সিলেট–চারখাই–শেওলা চারলেন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে শুরু হয়েছে সিলেট–চারখাই–শেওলা সড়কের চারলেন প্রকল্পের কাজ। প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে গত মঙ্গল ও বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করেছে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।
এই দুই দিনে জেলা প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ও শেওলা ইউনিয়নে চারলেন প্রকল্পের জন্য জরিপ পরিচালনা করেন। জরিপকালে প্রকৃত জমির মালিকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয় এবং প্রকল্পের স্বার্থে জমি হস্তান্তরের বিষয়ে মালিকদের অবহিত করা হয়। সরকারিভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাসে জমির মালিকরা স্বেচ্ছায় জমি ছাড়তে সম্মত হন।
উল্লেখ্য, এর আগে সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক শের এ মাহবুব মুরাদ এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাতিলের সুপারিশ করলে পূর্ব সিলেটজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি সর্বত্র আলোচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে উপজেলা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও সিলেটস্থ বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি পৃথক স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের জোর দাবির প্রেক্ষিতেই পুনরায় প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির ও সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন নিজ নিজ অবস্থান থেকে তদবির করেন বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সিলেট থেকে শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের যাতায়াত সহজ করতে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঋণ হিসেবে দেবে ২ হাজার ৮৮৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং সরকার দেবে ১ হাজার ৩৭০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া পরামর্শক সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ১০৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের আওতায় ২৪৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ, প্রায় ৪৩ কিলোমিটার চারলেন সড়ক, দুটি সার্ভিস লেন, ৩১টি কালভার্ট, তিনটি সেতু, একটি ফ্লাইওভার, ছয়টি ওভারপাস, দুটি আন্ডারপাস, চারটি ফুটওভারব্রিজ, সাতটি পায়ে চলার রাস্তা এবং একটি টোল প্লাজা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিলাদ মুহাম্মদ জয়নুল ইসলাম বলেন, “শেওলা স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পাথর, সিমেন্ট, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন অন্তত ২০০ ভারী ট্রাক চলাচল করে। কিন্তু জীর্ণ শেওলা সেতুর কারণে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। চারলেন সড়ক হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।”
আলীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহবাবুর রহমান খান শিশু বলেন, “এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমবে এবং আমদানি-রপ্তানিতে বড় পরিবর্তন আসবে। ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচও কমবে। জমি অধিগ্রহণ কাজে এলাকার মানুষ আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন।”
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, “সিলেট–শেওলা সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত ও নাজুক। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি। তার আশ্বাসের ধারাবাহিকতায় আজ ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই প্রকল্পের বাকি কাজ শুরু হবে।”
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, “রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও স্থানীয় জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা প্রকল্পটি পুনরায় বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়েছি। সরকারের আন্তরিকতা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কাজও শুরু হবে।”
ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় পূর্ব সিলেটের চার উপজেলার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: