পুলিশের গণবিজ্ঞপ্তি: জারি, প্রত্যাহার এবং দায়হীনতার নগ্ন উদাহরণ
Led Bottom Ad

পুলিশের গণবিজ্ঞপ্তি: জারি, প্রত্যাহার এবং দায়হীনতার নগ্ন উদাহরণ

দেবব্রত রায় দিপন

৩০/০৪/২০২৬ ২৩:৩৪:০৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল বন্ধে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে মাত্র একদিনের ব্যবধানে সেই বিজ্ঞপ্তি আবার প্রত্যাহারও করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এভাবে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে, নগরজুড়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, পরদিন তা তুলে নিলেই কি দায় শেষ হয়ে যায়? মোটেও নয়। বরং এটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক সীমালঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।


সাধারণত পুলিশের পক্ষ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধী শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা বা জরুরি নিরাপত্তা বার্তা দেওয়ার প্রয়োজনে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন, অনুমোদন বা পোর্টাল পরিচালনার প্রশ্নে পুলিশ কমিশনারের এমন নির্দেশনা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, এটি তাঁর এখতিয়ারের সীমা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।


২৯ এপ্রিল জারি করা ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সিলেটজুড়ে সংবাদকর্মী, নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের প্রশ্ন ছিল সরল—পুলিশ কমিশনার কি এখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও পালন করবেন? সংবাদমাধ্যমের বৈধতা নির্ধারণের ক্ষমতা কি এখন পুলিশের হাতে?


প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠতেই ৩০ এপ্রিল নতুন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এতে দায় মুছে যায় না। কারণ, একটি দায়িত্বহীন সিদ্ধান্তের ক্ষতি কেবল কাগজ প্রত্যাহার করে পুষিয়ে নেওয়া যায় না। জনগণের মনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, গণমাধ্যম সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা ছড়ানো হয়েছে, সাংবাদিকদের যে অযথা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে—তার জবাব কে দেবে?


বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন, লাইসেন্স, নীতিমালা ও অনুমোদনের দায়িত্ব তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কোনো পোর্টাল নিবন্ধিত কি না, অনুমোদিত কি না—এটি প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক প্রশ্ন। পুলিশের নয়। পুলিশের কাজ অপরাধ দমন, আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।


অর্থাৎ, কোনো পোর্টাল যদি প্রতারণা করে, চাঁদাবাজি করে, সাইবার অপরাধে জড়ায় বা ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হয়—তখন পুলিশ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু কেবল “অনিবন্ধিত” হওয়ার অভিযোগে বন্ধের হুমকি দেওয়া পুলিশের কাজ নয়। এই সীমারেখা না বোঝা ভয়ংকর। আর জেনেশুনে অতিক্রম করা আরও ভয়ংকর।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিলেটের অনলাইন গণমাধ্যমে কর্মরত অসংখ্য সংবাদকর্মীকে পরোক্ষভাবে অবৈধ, সন্দেহজনক বা ভুয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি শুধু অন্যায় নয়, অপমানজনকও। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের শত্রু নয়; গণমাধ্যম রাষ্ট্রের জবাবদিহির অংশীদার।


একজন পুলিশ কমিশনারের মূল দায়িত্ব হলো নগরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ছিনতাই-চুরি-ডাকাতি দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের আস্থা অর্জন করা। সিলেটবাসী দেখতে চায়—রাস্তায় নিরাপত্তা বাড়ছে কি না, অপরাধ কমছে কি না, থানায় সেবা সহজ হচ্ছে কি না। তারা দেখতে চায় না পুলিশ মূল দায়িত্ব ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।


যখন নগরে ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদক ও নানা অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তখন জনগণ আশা করে পুলিশ মাঠে থাকবে। অপরাধীর পেছনে থাকবে। নাগরিক সুরক্ষায় থাকবে। কিন্তু যদি পুলিশের মনোযোগ প্রশাসনিক প্রদর্শনীতে বেশি দেখা যায়, তাহলে আস্থাহীনতা তৈরি হবেই।


এই ঘটনার পর সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল একটি স্পষ্ট দুঃখপ্রকাশ। বলা উচিত ছিল—সিদ্ধান্তটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল, বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, আমরা দুঃখিত। কিন্তু তা হয়নি। বরং চুপিসারে প্রত্যাহার করে যেন সব শেষ—এমন ভঙ্গি নেওয়া হয়েছে।


বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা থাকলেই সব বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার জন্মায় না। দায়িত্ব যত বড়, সংযমের প্রয়োজন তত বেশি।


সিলেটবাসী এখন ব্যাখ্যা চায়। জবাবদিহি চায়। আর সবচেয়ে বেশি চায় এমন পুলিশ প্রশাসন, যারা নিজেদের সীমারেখা জানে, দায়িত্ব বোঝে এবং ভুল করলে ক্ষমা চাইতে জানে। সেটিই হবে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad