সুনামগঞ্জে হাওরজুড়ে ধান কাটার লড়াই: কৃষকের চোখ আকাশে
সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন শঙ্কা আর স্বস্তির এক অদ্ভুত লড়াই চলছে। একদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা, অন্যদিকে মেঘালয়ের পাহাড়ী ঢলের ভয় তারই মাঝে বৃহস্পতিবার এক চিলতে রোদ হাসি ফুটিয়েছে হাওরপাড়ের কৃষকদের মুখে। টানা পাঁচ দিন পর সূর্যের দেখা মেলায় ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে মেতে উঠেছেন তারা। তবে এই স্বস্তি স্থায়ী নাও হতে পারে, কারণ সামনের তিন দিনে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিচ্ছে আবহাওয়া অফিস।
বুধবার রাত থেকে সুনামগঞ্জ ও সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয়ে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রোদেলা আবহাওয়া বিরাজ করছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষাণ-কৃষাণীরা খলায় (ধান শুকানোর চত্বর) ভেজা ধান ছড়াচ্ছেন, কেউবা ব্যস্ত খড় শুকাতে। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে যে ধানগুলো ভিজে গিয়েছিল, রোদ ওঠায় সেগুলো নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা চলছে চারদিকে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় মোট ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত জেলায় মোট ৫০.৮১৯ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে অকাল বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ইতিমধ্যে ৯ হাজার ৫৪৯ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হাওর এলাকায় ১ লক্ষ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর আবাদের বিপরীতে কাটা হয়েছে ১ লক্ষ ৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর (৬২.৮৩৩%)। ননহাওর এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর আবাদের বিপরীতে কাটা হয়েছে ৯ হাজার ৭৩৮ হেক্টর (১৬.৭২২%)।
স্বস্তির মাঝে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বার্তা। সংস্থাটির সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল ইসলাম শোভন জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি, দ্বিতীয় দিনে ভারী থেকে অতিভারী এবং তৃতীয় দিনে পুনরায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে তৃতীয় দিনে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রাক-মৌসুমী বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকা মাত্রই দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে নিচু এলাকার ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলেই তা কেটে ফেলার আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে ঢলের পানিতে ফসলের ক্ষতি কমানো যায়।
আগামী ৭২ ঘণ্টা সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর জন্য অত্যন্ত সংকটময়। রোদ ও বৃষ্টির এই অসম লড়াইয়ে কৃষকেরা তাদের সারা বছরের শ্রমের ফসল কতটা ঘরে তুলতে পারবেন, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে প্রকৃতির মেজাজের ওপর।
প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: