অনিয়ন্ত্রিত হাউসবোট আর বর্জ্যের থাবা: অস্তিত্ব সংকটে টাঙ্গুয়ার হাওর
সুনামগঞ্জের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশের অনন্য ‘রামসার সাইট’ ও পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ECA) টাঙ্গুয়ার হাওর এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় যা ছিল হিজল-করচের ঘন বন, হাজারো প্রজাতির দেশি-পরিযায়ী পাখি এবং বৈচিত্র্যময় জলজ প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল, অনিয়ন্ত্রিত মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে সেই সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত হাউসবোট চলাচল। ধারণক্ষমতার বাইরে থাকা ডিজেলচালিত বোটগুলোর বিকট শব্দের কারণে পরিযায়ী ও দেশীয় পাখির স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শুধু শব্দদূষণই নয়, পর্যটকদের ফেলে যাওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল এবং হাউসবোটগুলোর অপরিশোধিত মানববর্জ্য সরাসরি মিশছে হাওরের পানিতে। ফলে একদিকে যেমন পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে চরম জীবনসংকটে পড়ছে জলজ প্রাণীকুল।
সংরক্ষিত এলাকা বা অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও টাঙ্গুয়ার হাওরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও 'চায়না দুয়ারী' জালের অবাধ ব্যবহার বন্ধ হয়নি। ছোট-বড় সব আকারের মাছ অবাধে ধরা পড়ার কারণে ব্যাহত হচ্ছে মাছের প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি, যা দ্রুত সংকুচিত করে আনছে হাওরের বিশাল জীববৈচিত্র্যকে।
প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট আরও নানা কারণে দিন দিন কমছে এই জলাভূমির আয়ু। উজান থেকে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বিপুল পলি জমা হয়ে ভরাট হচ্ছে হাওরের তলদেশ। এতে পানি ধারণক্ষমতা ও জলাভূমির আয়তন দুটিই আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
পাশাপাশি, হাওরের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত হিজল ও করচ গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ফলে ভেঙে যাচ্ছে হাওরের পাড়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওর বাঁচাতে এখনই কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:হাউসবোট নিয়ন্ত্রণ: নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা অনুযায়ী হাউসবোটের লাইসেন্স প্রদান করা এবং অভয়াশ্রম এলাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা।‘জিরো প্লাস্টিক’ নীতি: হাওর এলাকায় প্লাস্টিক বহন নিষিদ্ধ করা এবং প্রতিটি হাউসবোটে বাধ্যতামূলক পরিবেশবান্ধব স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনা করা।
টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল সুনামগঞ্জের স্থানীয় সম্পদ নয়, এটি পুরো দেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হাওরের মূল বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। দ্রুত টেকসই নীতি প্রয়োগ এবং স্থানীয় ও পর্যটকদের সচেতনতা নিশ্চিত করতে না পারলে অচিরেই এই রামসার সাইটটি তার রূপ ও অস্তিত্ব সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলবে।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: