মাতৃত্বের করুণ মাশুল, মৌলভীবাজারে দুই বোনের শিকলবন্দী জীবন

মাতৃত্বের করুণ মাশুল, মৌলভীবাজারে দুই বোনের শিকলবন্দী জীবন

নিজস্ব প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

২২/০৭/২০২৬ ১৩:৪০:২০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

যে ঘরে শৈশবের হাসি আর সন্তানের কলকাকলিতে মুখরিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধুই শিকলের করুণ ঝনঝনানি। একটি নয়, দুটি প্রদীপের আলো নিভে যাওয়ার গল্প; দুটি তাজা জীবনের একই নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি। গর্ভের সন্তান হারানোর গভীর শোক থেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন তারা। ভালোবাসার হাত বাড়ানোর বদলে ভাগ্যে জুটেছে স্বামীর দেওয়া নিষ্ঠুর তালাক। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সাহচর্যের অভাবে গত দেড় দশক ধরে একচালা ঘরের অন্ধকার কোণে শিকলবন্দী জীবনের করুণ প্রহর গুনছেন মৌলভীবাজারের জুড়ীর দুই বোন—আফিয়া ও রোবেনা।


মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর (চাক্কাটিলা) গ্রামের মৃত মরতুজ আলীর পরিবারে আজ যেন দুঃখের স্থায়ী বসত। পঁচিশ বছর আগে দিনমজুর স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন মেয়েকে নিয়ে অসীম কষ্টে সংসারের হাল ধরেছিলেন বৃদ্ধা জামিনা খাতুন। কিন্তু নিয়তির নির্মম খেলা যেন থামেনি।


বড় মেয়ে আফিয়া খাতুনকে (৩৫) বিয়ে দেওয়া হয়েছিল পার্শ্ববর্তী বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ এলাকায়। বিয়ের বছরখানেক পর প্রথম সন্তানটি মৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হলে গভীর মানসিক ধাক্কা পান আফিয়া। মানসিক ভারসাম্য হারালে চিকিৎসার ন্যূনতম উদ্যোগ না নিয়ে স্বামী তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় এবং একপর্যায়ে তালাক দেয়। কোনো উপায় না পেয়ে, পরিস্থিতির চাপে পড়ে বিগত ১৪-১৫ বছর ধরে আফিয়াকে শিকলবন্দী করে রেখেছেন মা।


একই ট্র্যাজেডির শিকার হন ছোট মেয়ে রোবেনাও (২৮)। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর মৃত সন্তান প্রসবের খবর পেয়ে হাসপাতালে তাকে ফেলে পালিয়ে যায় স্বামী ও শাশুড়ি। ভিটেমাটি বিক্রি আর ভিক্ষা করে হাসপাতালের বিল মিটিয়ে মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন মা। কিন্তু মাতৃত্বের এই অসীম শোক সহ্য করতে না পেরে রোবেনাও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। সুযোগ পেলেই স্বামীর ভিটার দিকে ছুটতেন বলে তাকেও বাঁধতে হয়েছে শিকলে। তাকেও পেতে হয়েছে তালাকের যন্ত্রণা। গত ৭-৮ বছর ধরে বোন আফিয়ার মতো রোবেনার ঠিকানাও এখন সেই লোহার শিকল।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ একচালা ঘরের এক কোণে স্যাঁতসেঁতে মাটির মেঝেই এখন দুই বোনের একমাত্র পৃথিবী। কখনো শিকল খুলে দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে রাখা হয়।


অশ্রুসজল চোখে আকুতি জানিয়ে বৃদ্ধা মা জামিনা খাতুন বলেন, “ভিক্ষা করে পেটের ভাত জোগাতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, মেয়ের চিকিৎসা কীভাবে করব? কোথায় ভালো ডাক্তার আছেন তা-ও জানি না। আমি একা মানুষ, আপনারা যদি একটু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন—হয়তো আমার মেয়েগুলো আবার আলো দেখতে পাবে।”


সামাজিক অসচেতনতা আর অর্থাভাবে দুটি তাজা প্রাণ আজ অন্ধকারের খাঁচায় বন্দী। সমাজের বিত্তবান, মানবিক সংগঠন ও প্রশাসনের একটু সহানুভূতির ছোঁয়া পারে আফিয়া ও রোবেনাকে শিকলমুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।


অসহায় মা জামিনা খাতুনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও দুই বোনের চিকিৎসার জন্য সাহায্য পাঠানো যাবে এই নম্বরে: বিকাশ (পার্সোনাল): 01785-666010 (জামিনা খাতুন)।

তাহির আহমদ

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad