মৌলভীবাজারে ১০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ ফেলে ঠিকাদার লাপাত্তা!

মৌলভীবাজারে ১০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ ফেলে ঠিকাদার লাপাত্তা!

নিজস্ব প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

০৪/০৭/২০২৬ ১৪:৪৭:৪১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মৌলভীবাজারে একটি প্রকল্পের ৩০ শতাংশ কাজ করেই লাপাত্তা রয়েছেন ঠিকাদার। প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও খোঁজ নেই ঠিকাদারের। তবে কাজ শেষ হবার আগেই মোটা অঙ্কের বিল তুলে নিয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।  


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলায় সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ১০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প। জেলার সদর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ড্রাফটসম্যান শাহিন আলম চাকরিরত অবস্থায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এ প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 


এদিকে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানেনও না, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কত টাকা বিল তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে, মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটি এ কাজ পেয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও নির্বাহী প্রকৌশলীর গাফিলতি এবং অনিয়মের কারণে প্রায় দেড় বছর ধরে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ ঝুলে আছে। কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই এক বছর ধরে উধাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে শত শত পরিবার বিশুদ্ধ পানির সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছে।


জানা যায়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের যৌথ বাস্তবায়নে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। এর অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি। ২০২১ সালে মৌলভীবাজারসহ ৩০টি জেলার ৯৮টি উপজেলায় প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থার জন্য পাইপলাইনভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে কমিউনিটিভিত্তিক পাইপলাইনের সাহায্যে হতদরিদ্র ও প্রান্তিক ৩০-৪০টি পরিবারে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার কথা। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও স্থাপন করার কথা। কিন্তু মৌলভীবাজারে এ প্রকল্পের কাজ দেড় বছর ধরে ঝুলে আছে। অথচ প্রকল্পটি ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল।


মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দুটি উপজেলার সব ইউনিয়নে ৭৬টি পানি সরবরাহ লাইন বসানোর কথা ছিল। এর মধ্যে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ৩৮টির মধ্যে ২২টিতে আংশিক কাজ হয়েছে। তবে রাজনগর উপজেলার ৩৮টিতে অসম্পূর্ণ কাজ রেখেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক বছর ধরে উধাও।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে মৌলভীবাজার জেলার সদর ও রাজনগর উপজেলায় ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ পায় প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেবি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজটি নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় কয়েকবার সময় বাড়ানো হয়। ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার বিল তুলে লাপাত্তা। সরেজমিনে রাজনগর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি শীর্ষক এ প্রকল্পের কাজের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই। স্থানীয়রাও এ প্রকল্প সম্পর্কে জানেন না। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের কির্তার মহল এলাকায় দেখা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আংশিক কাজ করেছে। পরে স্থানীয়রা নিজস্ব অর্থায়নে মোটর, পাইপ ও বিদ্যুতের মিটার সংযোগ করে নিজেরাই পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন।


কির্তার মহলের বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, ‘আমরা প্রায় এক বছর আগে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ করে পানির লাইন সচল করেছি। আমাদের এখানে ৩০টি পরিবার এই লাইন থেকে পানি সরবরাহ পায়। এখানে মোটর, পাইপ, মিটার, ওপরে ওঠার জন্য সিঁড়িসহ কিছুই দেওয়া হয়নি। কষ্ট করে আমরা নিজস্ব টাকা দিয়ে সব ঠিক করেছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে পাইপ লাগিয়েছিল, তা কয়েক দিনের মধ্যেই ফেটে গেছে। ছোট ছোট পাইপ লাগানো হয়েছে। খুব নিম্নমানের কাজ হয়েছে।’


জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদুজ্জামান কুমিল্লা জেলায় কর্মরত ছিলেন। সেই সুবাদে কাজটি পায় কুমিল্লার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক শাহিন আলম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে কর্মরত। তিনি নিজের নামে লাইসেন্স না করে বিভিন্ন সময় অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেবি) নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেন, মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালকের খুবই ঘনিষ্ঠ। এ কাজ করছেন শাহিন আলম। তিনি অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এ কাজ করছেন। শুধু এ কাজ নয়, আরও অনেক কাজ করছেন শাহিন আলম।


এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক রমিজ মিয়া বলেন, ‘এই কাজের মালিক হচ্ছেন শাহিন নামের একজন। তিনি জনস্বাস্থ্যে চাকরিও করেন, আবার ঠিকাদারিও করেন।’


তিনি আরও বলেন, ‘তিনি (শাহিন) ঠিকমতো কাজ করেন না। এজন্য আমি চলে এসেছি। এখন কী অবস্থা, আমি জানি না। আমি থাকা অবস্থায় ৯০ লাখ টাকার বিল তুলেছিলাম। এরপর টাকা তুলেছে কি না, আমার জানা নেই। অফিসের সিস্টেম অনুযায়ী কাজ পেতে হলে সবাইকে খুশি করতে হয়।’


এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহিন আলমের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।


এদিকে প্রকল্পের কাজ কতটুকু হয়েছে এবং কী পরিমাণ বিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তুলেছে, সে বিষয়ে জেলা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কিছু জানেন না। প্রকল্পের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদুজ্জামানের সঙ্গে অফিসে এবং মুঠোফোনে কথা বলতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহিন আলম একসময় ফেনী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ড্রাফটসম্যান ছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ২১ হাজার ৪৭০ টাকা বেতন স্কেলে চাকরিতে যোগ দেন। শাহিন আলম ২০১৮ সালে তৎকালীন রেলপথমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের সুপারিশে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ড্রাফটসম্যান হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ছয় বছরে তিনি শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রাক্কলনিক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এ কাজের বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। কত টাকা বিল উত্তোলন হয়েছে, তা আমরা জানি না। কাজ হয়েছে, একেবারে যে হয়নি তা নয়। প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমরা নতুন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেব।’


জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরি করে শাহিন আলম কীভাবে এ কাজ পেলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তবিবুর রহমান তালুকদার জানান, ‘সে (শাহিন) নিজের নামের লাইসেন্সে কাজ করেনি। অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে কাজ পেয়েছে।’


শাহিন আলম এ কাজ পাওয়ার পেছনে খালেদুজ্জামানের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি বলতে পারব না। তবে প্রক্রিয়া অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে।’


স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, এত বড় একটি প্রকল্প যদি এমন ধীরগতিতে চলে, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে উপকৃত হবেন? তারা দ্রুত প্রকল্পের কাজ শেষ করার আহ্বান জানান।

সজল আহমদ/ মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: