মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে তালা লাগানোর গোপন তথ্য ফাঁস

নেপথ্যে ছাত্রদল নেতার অনৈতিক প্রস্তাব

মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে তালা লাগানোর গোপন তথ্য ফাঁস

কামরান আহমদ, মৌলভীবাজার

০৩/০৭/২০২৬ ২২:৩১:৫৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে যুবদল ও ছাত্রদলের একাংশের বিরুদ্ধে অনৈতিক দাবি, আর্থিক আধিপত্য বিস্তার এবং প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব দাবি পূরণে অস্বীকৃতি জানানোয় কলেজের প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপে তালা খুলে কলেজের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো জেলা জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।


কলেজ সূত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সরকারি কলেজে মাস্টার রোলে কর্মরত ৬০ বছর ঊর্ধ্ব কর্মচারীদের অবসরে পাঠানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকজন কর্মচারীকে অবসরে পাঠায়। তবে জেলা যুবদলের সভাপতি জাকির হোসেন উজ্জ্বল অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে ওই কর্মচারীদের পুনর্বহাল করার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকে আল্টিমেটাম দেন।


অনুসন্ধানে জানা যায়, কেবল কর্মচারী পুনর্বহালই নয়, কলেজের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে একাধিক অনৈতিক দাবি উত্থাপন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, যুবদল নেতা জাকির হোসেন উজ্জ্বলের নির্দেশে কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ওয়ালিদ কলেজের অধ্যক্ষের কাছে বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো.কলেজের প্রতি মাসের সব ধরনের ক্রয়-বিক্রয় ও উন্নয়ন খাতের বরাদ্দের কাজ এককভাবে ছাত্রদল আহ্বায়ক ওয়ালিদকে দিতে হবে, বিগত ১ বছরের কলেজের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং ভবিষ্যতে সব কাজের লভ্যাংশ জাকির হোসেন উজ্জ্বল ও ওয়ালিদকে বুঝিয়ে দিতে হবে। এমনকি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগ যেভাবে প্রতি মাসে কলেজ থেকে ২ লক্ষ টাকা করে অবৈধ সুবিধা নিত, ঠিক একই কায়দায় এখন থেকে সেই অর্থ তাদের দেওয়ার দাবি জানানো হয়।


সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কলেজের আয়-ব্যয় নিরীক্ষার জন্য অডিট কমিটি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তর থাকা সত্ত্বেও, ছাত্রদলের এমন আইনবহির্ভূত ও জোরপূর্বক হিসাব চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়ায়। এসব অনৈতিক দাবি পূরণে কলেজ কর্তৃপক্ষ অপরাগতা প্রকাশ করলে জাকির হোসেন উজ্জ্বলের সরাসরি নির্দেশে কলেজের প্রশাসনিক ভবনে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।


উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমানকে অবহিত করে। সংসদ সদস্যের শক্ত পদক্ষেপ এবং জেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরদিন সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পুলিশ ফোর্সসহ উপস্থিত হয়ে কলেজের তালা খোলেন। তালা খোলার সময় ছাত্রদল নেতা ওয়ালিদ বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেন এবং যুবদল নেতা জাকির হোসেন উজ্জ্বল প্রশাসনকে হুমকি দিয়ে প্রশ্ন তোলেন—কেন তাদের না জানিয়ে তালা খোলা হচ্ছে এবং কেন আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হচ্ছে না। একই সাথে তিনি কলেজ অধ্যক্ষকে জোরপূর্বক অপসারণ ও দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার পর যুবদল নেতার অনুসারীরা কলেজ ক্যাম্পাসে বেশ কিছু মিছিল-মিটিংও করে।


স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মনসুর আলমগীর একজন নির্লোভ, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাবিদ হিসেবে জেলাজুড়ে সুপরিচিত। একজন শিক্ষাবিদের সাথে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এমন আচরণ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বাদ দিয়ে ছাত্রদলের শীর্ষ পদের নেতাদের এমন আর্থিক সুবিধা খোঁজার প্রবণতায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্য ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার যে অভিযোগ উঠছে, এই ঘটনা তারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।


ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব যখন দেশকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন স্থানীয় কিছু নেতার মাঝে সাবেক ফ্যাসিবাদের চরিত্র ও ছাত্রলীগের পুরোনো চাঁদাবাজির সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির এই অপচেষ্টায় তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।


বর্তমানে প্রশাসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত থাকলেও ক্যাম্পাসে এখনো এক ধরনের থমথমে ভাব বিরাজ করছে। সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে এমন অনৈতিক চাপ ও চাঁদাবাজির স্থায়ী অবসান দাবি করেছেন।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: