শেষ সুর থেমে গেল: কমলগঞ্জ হারাল প্রিয় ‘মদিনা ভাই’কে
বাঁশির সুরে মানুষকে মুহূর্তেই থামিয়ে দিতে পারতেন তিনি। হাসিমুখ, প্রাণখোলা স্বভাব আর সুরের মায়াজালে জড়িয়ে রাখা সেই পরিচিত মানুষ—সবার প্রিয় ‘মদিনা ভাই’—এবার সত্যিই চুপ করে গেলেন। তার বাঁশির সুর থেমে গেছে চিরতরে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ভেড়াছড়া গ্রামের এই ভ্রাম্যমাণ শিল্পী গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে স্ট্রোকজনিত কারণে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭০ বছর।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়—মৃত্যুর ঠিক আগের দিনও তিনি ছিলেন আগের মতোই প্রাণবন্ত। পহেলা বৈশাখের উৎসবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বাঁশির সুরে মানুষকে মুগ্ধ করেছিলেন। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি, এটাই হবে তার শেষ সুর, শেষ আনন্দ বিলানো।
দীর্ঘদিন ধরে কমলগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক চেনা মুখ ছিলেন মদিনা ভাই। বাঁশি বাজানোই ছিল তার প্রাণ, আর সেই সুরের সঙ্গে জুড়ে থাকত ছোট ছোট সার্কাস, মজার ম্যাজিক—বিশেষ করে কয়েনের খেলা। একটি কয়েন থেকে একাধিক কয়েন বের করার সেই কৌশল দেখে শিশুদের চোখে বিস্ময়, বড়দের মুখে হাসি ফুটে উঠত।
জীবন ছিল সংগ্রামের। কখনো রিকশা চালিয়ে, কখনো আইসক্রিম, বাদাম বা আচার বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। কিন্তু এসবের মাঝেও তিনি হারাননি তার শিল্পীসত্তা। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক কিংবা হামহাম জলপ্রপাত—যেখানেই যেতেন, সেখানেই তার বাঁশির সুর ভেসে উঠত, আর মানুষ থেমে যেত কিছুক্ষণ আনন্দ নিতে।
স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন শুধুই একজন শিল্পী নন—ছিলেন আনন্দের আরেক নাম। তাকে দেখলেই কেউ বলত, “মদিনা ভাই, একটা বাঁশি বাজান,” কেউ আবার বলত, “একটা খেলা দেখান।” তিনি কখনো কাউকে ফিরিয়ে দেননি; বরং হাসিমুখেই সবার আবদার পূরণ করেছেন।
তার এই হঠাৎ বিদায়ে কমলগঞ্জজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অনেকেই বলছেন, এমন মানুষ আর সহজে পাওয়া যাবে না—যিনি নিজের কষ্ট ভুলে অন্যকে আনন্দ দিয়ে গেছেন সারাজীবন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
একজন নিরহংকার, সহজ-সরল মানুষ, যার জীবনের বড় সম্পদ ছিল মানুষের ভালোবাসা—তার বিদায়ে কমলগঞ্জের আকাশে আজ যেন এক টুকরো সুরহীন নীরবতা।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: