মাছের ডালায় ডালায় স্মৃতি-সেলফি—শেরপুরে শতবর্ষী মেলায় উৎসবের ছোঁয়া
পৌষসংক্রান্তি এলেই কুশিয়ারা নদীর পাড়ে জমে ওঠে এক আলাদা উৎসব। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শেরপুরে বসা শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলায় এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদ যেন এই মেলায় এসে নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। মাছ কেনাবেচার পাশাপাশি এটি এখন স্থানীয় মানুষের আনন্দ, মিলনমেলা আর স্মৃতি তৈরির জায়গা।
গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় শুরু হওয়া মেলাটি রাতভর চলে পাইকারি কেনাবেচায়। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল থেকেই খুচরা বিক্রিতে ভিড় জমাতে থাকেন স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা। আগামী বুধবার সকাল পর্যন্ত এই উৎসবমুখর পরিবেশ থাকবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
ডালায় সাজানো তাজা মাছ ঘিরে চলছে দরদাম আর হাঁকডাক। সেই সঙ্গে মোবাইল ফোনে সেলফি তোলার ব্যস্ততাও চোখে পড়ছে। কেউ বিশাল আকারের মাছের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার মাছের সঙ্গে মুহূর্ত ধরে রাখছেন স্মৃতির ফ্রেমে।
মেলায় বড় আকর্ষণ বিশালাকার মাছ। বিক্রেতারা নিয়ে এসেছেন প্রায় দুই মণ ওজনের বাঘাইড় মাছ, যার দাম হাঁকা হচ্ছে তিন লাখ টাকা। এ ছাড়া আইড়, বোয়াল, চিতলসহ বড় আকারের নানা মাছ দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ছে।
বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ, গ্রাসকার্পসহ নানা জাতের তাজা মাছ মিলছে মেলায়। হাকালুকি, হাইল হাওর, কাউয়াদীঘি ও কুশিয়ারা নদীর মুক্ত জলাশয়ের মাছের চাহিদা বেশি। তবে হাওর ও নদী ভরাট হওয়ায় স্থানীয় মাছের সরবরাহ কমেছে। ফলে দামে কিছুটা ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে এবং চাষের মাছের উপস্থিতিও বেড়েছে। বিক্রেতারা জানান, সারা বছর মাছ সংরক্ষণ করেই এই মেলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
দাম নিয়ে ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কেউ বলছেন, চার কেজি বোয়াল চার হাজার পাঁচ শ টাকায় পাওয়া গেছে—দাম মন্দ নয়। আবার কেউ মনে করছেন, কিছু মাছের দাম তুলনামূলক বেশি। তবে রাত বাড়লে দাম কিছুটা কমে আসে বলে জানান বিক্রেতারা।
প্রায় এক শ বছর আগে মনুমুখ ইউনিয়নের মনুপাড়ায় শুরু হয়েছিল এই মাছের মেলা। মনু নদীর ভাঙনের কারণে পরে মেলাটি শেরপুরে স্থানান্তর করা হয়। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এখানেই টিকে আছে এই ঐতিহ্য। এক বিক্রেতা বলেন, ‘এই মেলা আমাদের ময়মুরব্বিরা চালাইছেন। আমি মাছ বেচছি, আমার ছেলেও বেচবে।’
মাছের পাশাপাশি মেলায় মিলছে খেলনা, খই-মোয়া-গজা, মুখরোচক খাবার, কৃষিপণ্য ও ঘরসংসারের নানা সামগ্রী। শতবর্ষী এই মাছের মেলা এখন শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, সিলেট অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: