নিরাপত্তা কি শুধু প্রভাবশালীদের অধিকার?
দৃশ্য বনাম দৃশ্যান্তর!
সিলেট নগরীতে সাম্প্রতিক ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো এখন শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির প্রকাশ, পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন এবং প্রশাসনিক দায়বোধের নির্মম পরীক্ষাও বটে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশের তৎপরতায় যে বৈষম্য চোখে পড়ছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ, হতাশা ও অনাস্থা তৈরি করছে।
৬ মে দক্ষিণ সুরমার চান্দাই পশ্চিমপাড়ায় এক নারী তাঁর শিশুসন্তানকে নিয়ে মাদ্রাসায় যাচ্ছিলেন। পথে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা শিশুর গলায় ছুরি ধরে মায়ের গয়না ছিনিয়ে নেয়। পরদিন ৭ মে নগরের কেওয়াপাড়ায় আরেক নারী র্যাব পরিচয়ে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। দিনের আলোতে, ব্যস্ত নগরীতে, মানুষের চোখের সামনে এমন দুঃসাহসিক অপরাধ সংঘটিত হলো। ঘটনাগুলোর ভিডিও, ছবি, ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ— সবকিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। পুরো নগর আতঙ্কিত হয়ে উঠল।
কিন্তু পুলিশ কোথায় ছিল? কোথায় ছিল তাৎক্ষণিক অভিযান? কোথায় ছিল নগরবাসীকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়ার দৃশ্যমান উদ্যোগ? কোথায় ছিল পুলিশ কমিশনারের জরুরি বার্তা বা কঠোর অবস্থানের ঘোষণা? বাস্তবতা হলো— সাধারণ মানুষ পুলিশের সক্রিয় উপস্থিতি দেখেনি, দেখেছে কেবল রুটিন বক্তব্য— “তদন্ত চলছে”।
অথচ এর মাত্র একদিন পর ৮ মে সিলেট মহানগর বিএনপির নেতা নাসিম হোসাইনের ৫০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। পুলিশ বলছে, তারা “ছায়া তদন্ত” চালিয়ে দ্রুত রহস্য উদঘাটন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে— এই দক্ষতা, এই দ্রুততা, এই পেশাদারিত্ব কি কেবল রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত?
দুই নারী ভুক্তভোগীর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুস্পষ্ট ভিডিও ও তথ্য ছিল। অপরাধ সংঘটনের ধরনও ছিল ভয়াবহ ও প্রকাশ্য। তবুও সেখানে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত একজন নেতার অর্থ লুটের ঘটনায় রাতারাতি গ্রেপ্তার। এই বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষ জানতে চায়— পুলিশের কাছে কি একজন রাজনৈতিক নেতার ৫০ লাখ টাকা একজন মায়ের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? শিশুর গলায় ধরা ছুরির চেয়ে কি প্রভাবশালী ব্যক্তির টাকার মূল্য বেশি?
আইনের চোখে সব নাগরিক সমান— এই কথাটি রাষ্ট্র প্রায়ই উচ্চারণ করে। কিন্তু বাস্তবতা যখন বারবার উল্টো চিত্র দেখায়, তখন সেই কথাগুলো নিছক স্লোগানে পরিণত হয়। কারণ মানুষ এখন দেখছে, অপরাধের গুরুত্ব নয়; ভুক্তভোগীর পরিচয়ই যেন পুলিশের তৎপরতার গতি নির্ধারণ করছে।
এখানেই এসে সবচেয়ে বড় দায় বর্তায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং এর কমিশনারের ওপর। একজন পুলিশ কমিশনার শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি পুরো নগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রধান অভিভাবক। নগরবাসী তাঁর কাছ থেকে নিরপেক্ষতা, দ্রুততা এবং দৃশ্যমান নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সেই নেতৃত্বের দৃঢ় উপস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার মহোদয়ের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— নগরবাসী কি সমান নিরাপত্তা পাচ্ছে? যদি পেয়ে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের ঘটনায় সেই একই গতিতে তদন্ত ও গ্রেপ্তার হচ্ছে না কেন? আর যদি না পেয়ে থাকে, তাহলে এটি কি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা নয়?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বৈষম্যমূলক তৎপরতা অপরাধীদের কাছেও ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়। তারা বুঝে যায়— সাধারণ মানুষ টার্গেট হলে প্রশাসনিক চাপ কম, জনমনে ক্ষোভ কিছুদিন পর থেমে যাবে। কিন্তু প্রভাবশালী কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলেই পুরো বাহিনী নড়ে বসবে। এই সংস্কৃতি ভয়ংকর। এটি আইনের শাসনকে দুর্বল করে, অপরাধকে উৎসাহিত করে এবং জনগণকে রাষ্ট্র থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে।
সিলেট নগরীতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায় এড়ানো নয়, দৃশ্যমান জবাবদিহি। প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নাগরিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। পুলিশ কমিশনার মহোদয় যদি সত্যিই নগরবাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে চান, তাহলে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে— পুলিশের কাছে একজন সাধারণ মা, একজন পথচারী, একজন শিশু এবং একজন রাজনৈতিক নেতা— সবার নিরাপত্তার মূল্য সমান।
অন্যথায় মানুষের মনে এই ধারণাই আরও শক্ত হবে যে, এই নগরে বিচার ও নিরাপত্তা এখনও সবার জন্য সমান নয়; তা নির্ভর করে আপনি কে, কতটা প্রভাবশালী এবং ক্ষমতার কতটা কাছাকাছি।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: