মানুষ সুখী হতে চায়; কিন্তু সুখেরা থাকে কোথায়?
Led Bottom Ad

মানুষ সুখী হতে চায়; কিন্তু সুখেরা থাকে কোথায়?

মনোয়ার পারভেজ

০৮/০১/২০২৬ ২১:২১:৪৪

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

আমরা আসলে ব্যক্তি জীবনে কতটুকু সুখী? সুখের ঠিকানা বা গন্তব্য আসলে কোথায়? এটিই আমরা নির্ধারণ করতে পারি না। যদিও আমরা মানুষ জাতি হচ্ছি সুখ বিলাসী। একটু খানি সুখের খোঁজেই আমাদের এই জীবন সংগ্রাম। জীবিত থাকা পর্যন্ত সে সংগ্রামের শেষ নেই। শেষপর্যন্ত কি আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত সুখের ঠিকানায় পৌছাতে পারছি? পারলেও কতটুকু পারছি? সেটা আমরা নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেও অবশ্য কিছুটা উত্তরের খোঁজ পেতে পারি। আমাদের নিজের সুখ যা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আমাদের নিজের মধ্যেই। নিজের মন, কর্ম ও বিবেকের মধ্যে। ব্যক্তিগত ভাবে যদি আমি নিজকে অনেক সময় সুখী মনে করি এই ভেবে, যে আমি আজকে যে অবস্থানে আছি সেটা অনেকের কাছে স্বপ্ন। তারপরও মনের মধ্যে কত দুঃখ-কষ্ট আড়াল থাকে। আমার থেকেও খারাপ অবস্থানে আমার আশেপাশের অনেকেই আছেন। মধ্য রাতে যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই। রাস্তার পাশে রাত কাটানো মানুষ যখন দেখি তখন বুঝা যায় কতটুকু সুখে আছি আমরা। রেল লাইনের পাশের বস্তুি গুলোর দিকে তাকালে বুঝতে পারি আমরা কতটুকু সুখে আছি। হয়তো তারাও এই পাওয়া টুকুও সুখের করে নিয়েছেন। দু-মুটো খেয়ে রাস্তার পাশে রাত কাটিয়ে দেওয়া, এই চাওয়া টুকু থেকেই নিজের সুখ খোঁজেন। তারপরও কি তারা সুখী? তাদের ভাগ্য কি এখানেই সীমিত? মনের মধ্যে কি কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, প্রশ্ন নেই? দূর থেকে বা আমরা আর কতটুকুই জানি। দূর থেকে আমাকেও তো মানুষ সুখী ভাবে। কিন্তু আমিও কী সত্যি সুখী? 


মমতাজ উদ্দীন আহমদের 'সুখী মানুষ' গল্প আমাদের একটি বার্তা দিয়েছিল, তা ঠিক। গল্পের সারমর্ম হচ্ছে, গ্রামের মোড়ল যার অর্থ-বিত্তের অভাব নেই। তবুও তার জীবনে সুখ নেই। সে খুবই লোভী ও অত্যাচারী। একবার তার এমন অসুখ হয়, সেটা আর ভালো হচ্ছে না। আসলে এই অসুখ কঠিন আসুক, বলা যায় মনের অসুখ। অর্থ-বিত্তের বড়াই ও আরও পাওয়ার অসুস্থ। কবিরাজ ফন্দি করে তাকে বললেন, এ রোগ থেকে সেরে উঠার শেষ উপায় হচ্ছে একজন সুখী মানুষের জামা লাগবে। সেটা পড়লে মনের রোগ ভালো হয়ে যাবে। আশেপাশে পাঁচ গ্রাম ঘুরেও কোনো সুখী মানুষ পাওয়া গেল না। অর্থাৎ কেউই নিজের মতো করে সুখী নয়। শেষ পর্যন্ত যখন একজন দিনমজুর, অর্থাৎ দিন এনে দিন খাওয়া ৪০ বছরের এক চাষা লোককে খোঁজে পাওয়া গেল সুখী মানুষ হিসেবে। অথচ তার কোনো জামা নেই। কারণ খুঁজতে গেলে জানা যায় তার যেহেতু বাড়তি টাকা-পয়সা নেই, তাই এতো চিন্তা নেই টাকা-পয়সা নিয়ে। টাকা কোথায় রাখবে এই নিয়ে চিন্তা নেই, সম্পদ চুরি হওয়ার ভয় নেই। দিনে যা রুজি করবে তাই খেয়ে দিন শেষ করবে। এটা যদি মন থেকে মেনে নেওয়া যায় তাহলেই তো মনের ভিতরে সুখ খোঁজে পাওয়া যায়। সেই সুখী মানুষ গল্পের সুখী থাকার সুন্দর উদাহরণ। গল্পটি পাঠের মাধ্যমে আশাকরি আমরা সুখের ঠিকানায় এটি গন্তব্য নির্ধারণ করতে পারি। তারপরও আমরা আমাদের জায়গা থেকে সবাই সুখী হতে পারি না। সেই সুখী মানুষটাই কী সত্যিকারে সুখে আছে? এটাতো নিছক গল্প। সমাজে বার্তা দিতে লেখক এমন ভাবে গল্প সাজিয়েছেন। সত্যিকারেও তো এমন মানুষ আছে। তারাও কি তাদের অবস্থান থেকে সত্যিই সুখী? মেনে নিতে পারলে অবশ্য নিজেকে সুখী ভাবা যায়। কিন্তু কয়জন এভাবে মেনে নিতে পারেন? হুমায়ূন আহমেদের 'গৃহত্যাগী জোছনা' কবিতা পাঠ করে গৃহত্যাগী হওয়ার বাসনা প্রকাশ করে থাকেন। গৃহে তার সুখ নেই। এই জোছনা রাতে গৃহত্যাগেই যেন সব সুখ। অথচ সত্যিকারে গৃহহীন মানুষেরা একটা গৃহের জন্য সংগ্রাম করে থাকেন। তারাও মনে করেন গৃহ পেলেই সুখী হবেন। এই চিন্তাও কিন্তু অবান্তর নয়। 


সুখী হতে হলে আমাদের প্রাথমিক চিন্তা থাকে, আমার অনেক অনেক অর্থ-বিত্তের প্রয়োজন! আসলে আমরা সুখ খোঁজতে গিয়ে অর্থবান হয়েও সুখী হতে পারি না। কেননা তখন আমাদের মধ্যে আরও পাওয়ার ইচ্ছা জাগে। আর সেই আরও পাওয়ার ইচ্ছা আমাদের সুখী থাকতে দেয় না! আবার অর্থ হারানোর, চুরি হওয়ার ভয় থাকে। আর এইজন্যই হয়তবা বলা হয়, টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না। অর্থ-সম্পদও অনেক সময় অসুখী হওয়ার কারণ হয়। সুতরাং সুখী হতে হলে টাকা বিষয়টি আহামরি কিছু না আবার অনেক কিছুই। কারণ, সুখী হতে হলে টাকার প্রয়োজনীয়তা নেই এমনও বলা যাবে না। ব্যক্তি জীবনের সাময়িক সীমিত ভোগ, বিলাস ও দু-মুটো খেয়ে বেঁচে থাকতে হলেও অবশ্যই টাকার প্রয়োজন রয়েছে। সত্য ও সঠিক পথে টাকা উপার্জন করে আমাদের অর্থের প্রয়োজনীয়তা যদি সঠিক পথেই সীমিত সীমিত রাখতে পারি, নিজের মন থেকে মেনে নিতে পারি তখনই আমরা জীবনের সুখ উপলব্ধি করতে পারব। সৎ থেকে উপার্জনে একটা উপকারিতা রয়েছে, এতে আমি যতটুকু পরিশ্রম করব ততটাই পাওয়ার আশা থাকবে। কারণ, অতিরিক্ত পাওয়ার ইচ্ছে আমাকে সঠিক পথে থাকতে দিবে না। তখনই আমরা অর্থ উপার্জন এর জন্য নানা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করি। তাই সত্য ও সঠিক পথে উপার্জনে মন স্থির রেখে সৎ পথে থাকতে পারলে আমরা সুখের খোঁজে পেতে পারি। এতে একটা মানসিক প্রশান্তি রয়েছে, নিজের সততা ও আত্মমর্যাদার প্রতি। কিন্তু আমরা যদি সামাজিক প্রতিযোগিতা ও পুঁজিবাদী ফাঁদে পড়ে যাই, সুখ তখন পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। 


ক্ষেত্রবিশেষ অর্থ-বিত্ত ছাড়াও মানুষ নানাভাবে সুখ-শান্তি খোঁজে। আপনি নিজের ভালোলাগা, উপভোগ্য বিষয় থেকেও সুখ খোঁজে পেতে পারেন। আপনি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছেন আপনার সুখের বিষয়টি আপনাকে নিজেই খোঁজে নিতে হবে। অগত্যা কেউ আপনাকে কেউ সুখ এনে দিবে না। আপনার দৈনন্দিন রুটিনে আপনার সুখের নিমিত্ত বিষয়টি খোঁজে নিতে হবে। আমরা অনেক সময় ছোট ছোট বিষয় গুলো থেকেই জীবনের সুখ কিংবা উপভোগ খোঁজে পেতে পারি। যেমন আপনার ভিতর থেকে যে কাজটা করতে খুব ভালো লাগে সেই কাজটায় নিয়জিত থাকতে চেষ্টা করতে হবে। সারাদিনের ব্যস্ততা থেকে একটু হলেও নিজকে সময় দেওয়ার জন্য সময়টুকু বের করে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের সকল মানুষের অন্তরে প্রতিভা নামক একটা উজ্জ্বলতা লুকিয়ে থাকে। সেই প্রতিভাটা যদি প্রকাশ করতে পারেন সেটাই আপনার সুখ, আপনার উপভোগ্যের বিষয়। সুতরাং জীবনের শত ব্যস্ততায় আপনার ভিতরের সুপ্ত প্রতিভাকে ভালোর দিকে জাগ্রত রাখতে হবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র টাকা ও নামের পিছনে না ছুটে জীবনকে উপভোগ করাও শিখতে হবে। যেন পরবর্তীতে জীবন নিয়ে আফসোস করতে না হয়। অর্থাৎ জীবনে যতটা পারা যায় আফসোস রাখতে নেই। তখনই হয়তো নশ্বর পৃথিবীতে হতাশার মধ্যে দিকে কিছুটা হলেও নিজের সুখটাকে খোঁজে পাবেন। 


অর্থ-সম্পদ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পিছনে ছুটতে ছুটতে অনেকেই তার জীবনের মূল্যবান সময়টুকু শেষ করে দিচ্ছে। অথচ জীবনটাকেই উপভোগ করতে পারেনি। মৃত্যুর পূর্বে চরম হতাশা আর দুর্দশায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। তার মৃত্যু কিন্তু সেদিনই হয়ে গেছে, যেদিন থেকে শুধু টাকার পিছনে ছুটতে শুরু করেছে। বাকী পরে থাকে শুধু দেহের মৃত্যুর অপেক্ষায়, দেহের মাটি চাপার জন্য! মনের মৃত্যু আগেই ঘটে যায়। তাই শুধু শুধু টাকার পিছনে না ছুটে অর্থের জোগানের পাশাপাশি জীবনের উপভোগ্যর বিষয়টির প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, সুখ একটি আপেক্ষিক বিষয়। এটা নিজের উপর নির্ভর করে। এছাড়া সুখের কোনো নির্ধারিত কোনো গন্তব্য নেই। পৃথিবীতে সুখ একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। কারও অনেক সম্পদ থেকেও জীবনে সুখ নেই। আবার কেউ কেউ কিছু না থাকলেও জীবনে অনেক সুখী হতে পারে। তবুও কেউ পুরোপুরি সুখী হতে পারছে না। কেননা তুমি যতটুকু মেনে নিবে ততোটুকুই সুখ, আর যতটুকু মেনে নিতে পারবে না সেই ততটুকুই দুঃখ। অর্থাৎ সুখের সাথে কিঞ্চিত হলেও দুঃখ থেকে যাচ্ছে।


তবুও মানুষের মনস্তাত্বিক যে সুখ, এটা আর মানুষের একান্তই নিজের মধ্যে আর নেই। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে যদি বলি- পুঁজিবাদী অর্থনীতি, বাজারদর এসব মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। পুঁজিবাদ মানুষের ব্যয়বহুল করে তুলেছে। মানুষকে শেখাচ্ছে তুমি পুঁজি করো, টাকার পাহাড় গড়ো। এতে গরিবের পকেট কেটে ধনীর উগাড় বড়ো। সেখানে গরীব যেমন দুখী, ধনিক শ্রেনিও অসুখী। এতে ধনিক শ্রেনি সাময়িক সুখী হলেও সত্যিকারে সুখী হতে পারছে না। ব্যক্তিগত ভাবে তুমি ভেবে নিলে সুখী হতে তোমার কিছু প্রয়োজন নেই। কিন্তু তোমার প্রিয়জন, পরিবার ও সামাজিক পরিচয়ের জন্য তোমারও কিছু প্রয়োজন। এই প্রয়োজন মিটিয়ে নিতে গিয়ে আবার সুখী হওয়া যাচ্ছে না। এইযে 'সুখী মানুষ' গল্পের দিনমজুর, তার জামা নেই। সে নিজেকে সুখী ভাবছে। কিন্তু সত্যিই কি এভাবে সুখী হওয়া যাচ্ছে? নিছক এই গল্পের উদাহরণ টেনেই যদি বলি, শীতকালে তো তার গরম কাপড় অর্থাৎ জামার প্রয়োজন। এই প্রয়োজন মিটাতে গেলেই দেখা যাবে সে সুখী থাকতে পারছে না। রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে যদি থাকাই, বস্ত্র অর্থাৎ জামা তার অধিকার। কিন্তু সে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর সেটা হচ্ছে এই গল্পের মোড়লদের মতো লোকদের জন্যেই কিন্তু। সাম্রাজ্যবাদ তোমার সুখ নিয়ন্ত্রণ করছে। লুটেরা শ্রেণি তোমার সুখ'কে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ সে-ও সুখী হতে পারছে না। একজনের সুখ অন্যজন কেড়ে নিচ্ছে। মানুষের কাছে সুখের সব উপক্রম থাকা সত্বেও অথবা সবকিছু মেনে নিলেও সুখী হওয়াটা জটিল। রাষ্ট্রের নাগরিক নিরাপত্তা, সামাজিক সহাবস্থান না থাকলে এবং আরও নানা জাতীয় ও ব্যক্তিগত ইস্যুতে যখন সংকট ও দুশ্চিন্তা থেকে যায়, তখন সুখ আর পুরোপুরি থাকে না। অর্থাৎ সুখ যতটা আপেক্ষিক বিষয়, যতটা মেনে নেওয়ার বিষয়, ততটা আবার রাষ্ট্র ও সমাজের উপরও নির্ভর করে।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad
Led Bottom Ad