‘মিনিস্টার বাড়ি’ শুধু একটি স্থাপনা নয়,সিলেটের সংস্কৃতি ও নাগরিক স্মৃতির ধারক
Led Bottom Ad

‘মিনিস্টার বাড়ি’ শুধু একটি স্থাপনা নয়,সিলেটের সংস্কৃতি ও নাগরিক স্মৃতির ধারক

প্রথম ডেস্ক

২৬/১০/২০২৫ ১৩:৪৩:৫৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেট মহানগরীর মিনিস্টার বাড়ি খ্যাত ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ভেঙ্গে ফেলার উদ্যোগে সচেতন মহলে বেশ প্রতিক্রিয়া ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যারা বাড়িটির পক্ষে আছেন তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- ‘এটা একটা প্রাইভেট প্রপার্টি’ এবং সেখানে মাল্টটিস্টোরেজ ভবন সেখানে নির্মান হবে। সুতরাং সেই প্রয়োজনে স্থাপনাটি ভাঙা হচ্ছে।’ 


এখানে উল্লেখ করা অবশ্যক, হেরিটেজ ও ঐতিহাসিক ভবন কখনো প্রাইভেট হয় না, এটা গোটা অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে পড়ে। এই বিষয়টি শিক্ষিত ও সচেতন আধুনিক মানুষ মাত্রই জানেন। উদাহরনস্বরূপ কবিগুরুর জোড়াসাকোর ঠাকুর বাড়ি, আহসান মন্জিল, কিংবা বাংলা একাডেমীর ভেতরের বর্ধমান ভবন, পুরান হাইকোর্ট, জিতু মিয়ার বাড়ি ইত্যাদি। এগুলো কেবল ব্যাক্তিগত অধিকারের দাবি তুলে কেউ হাত দিতে পারবে না, এটা এখন সকল মানুষের কৃষ্টি-ইতিহাসের অধিকারী।


আমরা এমসি কলেজের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষনের দাবি তোলতে সিলেটের সর্বস্হরের মানুষ সমর্থন দিয়েছেন। তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে আলি আমজাদের ঘড়ি ঘর রক্ষায় সিলেটের মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। এ বিষয়ে পৃথিম পাশার আলী আমজদের পরিবার বলেছেন- এটা এখন কোন পারিবারিক বিষয় নয়, এটি সিলেটের ঐতিহ্য। তেমনি শহীদ শামসুদ্দিন ছাত্রাবাসের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি স্মারক রক্ষায় সিলেটের নাগরিক সমাজ উদ্যোগী হয়েছেন। সেখানে মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে।


সিলেটের পাঠানটুলার ‘মিনিস্টার বাড়ি’ শুধু একখণ্ড ইট-পাথরের স্থাপনা নয়—এটি এক যুগের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নাগরিক স্মৃতির ধারক। পিতা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। পুত্র আইনজীবী ও শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল হামিদের নির্মিত এই বাড়ি সিলেটের শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক উত্থানের সাক্ষ্য বহন করে। এখানে ইতিহাসের পদচিহ্ন, প্রজন্মের গল্প, স্থাপত্যের স্বকীয়তা—সবই জড়িত। তাই এই বাড়ি ভাঙা মানে শুধু একটি ভবন হারানো নয়; হারিয়ে যাচ্ছে শহরের অতীতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের সেতুবন্ধন। ঐতিহ্য মানে যা আমাদের পরিচয়ের ভিত গড়ে—‘মিনিস্টার বাড়ি’ সেই পরিচয়েরই প্রতীক।


আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ বলেন, ঐতিহ্য-সম্পর্ক-বিহীন-সংস্কৃতি-সাধনাও অসম্ভব। ঐতিহ্যে যাহা কিছু ভাল তাহার অনুসরণ এবং যাহা কিছু নিন্দনীয়, তাহার বর্জনেই নূতন জীবনাদর্শের সন্ধান মিলে। সংস্কৃতির রূপান্তরও এইভাবেই ঘটে। অগ্রগতিও আসে এই পথে।

কলকাতার অভিজ্ঞতা লিখতে ইচ্ছে করছে, প্রামাণ্য হিসেবে, আইনের সুরক্ষা ও নাগরিক ঐতিহ্য হিসেবে উদাহরণ টানা যায়। অভিজ্ঞতা ও পদক্ষেপ আমাদের বাস্তবতায় রিলেট করা যায়। পশ্চিম বঙ্গের রাজ্য সরকার কলকাতার হেরিটেজ ভবন সংরক্ষণের জন্য Public–Private Partnership (PPP) মডেলে একটি নতুন নীতি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—হেরিটেজ ভবনের সংরক্ষণ ও ব্যবহারের আইনি কাঠামো নির্ধারণ, যাতে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মর্যাদা ও কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে।


বেসরকারি সংস্থা যদি বাণিজ্যিকভাবে ভবন ব্যবহার করতে চায়, তবে নির্দিষ্ট শর্ত ও অনুমোদন অনুযায়ী তা করতে হবে।

হেরিটেজ শ্রেণিবিন্যাস (Grade I, II-A, II-B, III) অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তনের মাত্রা নির্ধারিত থাকবে—গ্রেড I ভবনে কোনো পরিবর্তন চলবে না, নিম্ন গ্রেডে সীমিত পরিবর্তন সম্ভব।


বাড়ির মালিকের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে—তিনি চাইলে মেরামতের পর ভবনের অংশে বসবাস করতে পারবেন বা সমমূল্যের সম্পত্তি পাবেন। নীতির প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, পর্যটন দপ্তর ও কলকাতা পুরসভা যৌথভাবে কাজ করবে এবং ভবন ও সৌধের মতো, ঐতিহ্যবাহী গাছকেও হেরিটেজ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এসব অরণ্যে রোদন হতে পারে, তবে সভ্য মানুষের দুনিয়ায় টিকে থাকতে ও মর্যাদা মন্ডলীতে ঠিকতে এসবের যত্ন নিতে হবে।


ভবনটির ভাঙার চিত্র দেখে অনেকের হৃদয় ভারাক্রান্ত। যারা ঐতিহ্য সচেতন তারা এই সকল স্থাপনা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ না হলেও ব্যাক্তি পরিসরে জনমত গঠন করছেন। সিলেটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি ট্রাস্ট গঠিত হয়েছে। সিলেটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সিলেটের নাগরিকসমাজ সংগঠিত হয়ে সচেতনতা গড়ে তোলবেন। আমরা আশাবাদী হতে চাই।  


লেখক

গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন

আইনজীবী

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

পরিবেশ ও সংস্কৃতি সংগঠক

রোদ্দুর রিফাত

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad
Led Bottom Ad