বাজি ফুটিয়ে পাপাচার নয়,পূজাচারে ব্রতী হোন
পূজা মানেই আনন্দ, ভক্তি আর আত্মিক পরিশুদ্ধি— এটাই শাস্ত্রীয় ভাবনায় বলা আছে। পূজা মূলত এক ধরনের আরাধনা, যেখানে মন, বাক্য ও কর্ম — তিনটি স্তরেই ভক্তির প্রকাশ ঘটে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজকের দিনে পূজা মানে অনেকের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল উৎসব ও বিনোদনের মিশেল। ধর্মীয় গাম্ভীর্যের জায়গা দখল করেছে আধুনিকতার নামে এক ধরনের অবক্ষয়, যা ধীরে ধীরে পূজার প্রকৃত উদ্দেশ্যকেই বিকৃত করছে।
দুর্গাপূজার সময় এ প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। প্রতিটি মন্দিরে পূজার সময় বা প্রতিমা দর্শনের মুহূর্তে হিন্দি গানের তালে নাচে মাতোয়ারা তরুণ-তরুণীরা। অথচ যে মাকে ‘জননী’ বলে সম্বোধন করা হয়, তাঁর সামনে এমন অশোভন বিনোদনের আয়োজন কখনোই শাস্ত্রসম্মত নয়। পূজা উদযাপন পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো যদি ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শী ও দায়িত্বশীল হতো, তবে এমন দৃশ্য হয়তো দেখা যেত না। প্রতিটি মন্দিরে পূজার আগে যথাযথ নির্দেশনা থাকলে পূজার মর্যাদা রক্ষা পেত, ধর্মচেতনার বিকাশ ঘটতো।
শ্যামা পূজা— শক্তির আরাধনার এক অনন্য রূপ। এটি সেই পূজা যেখানে মানুষ নিজের অন্তর্গত অন্ধকার দূর করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প নেয়। কিন্তু আজ সেই শ্যামা পূজা অনেক সময় পরিণত হচ্ছে শব্দদূষণ ও অপসংস্কৃতির উৎসবে। পূজার একদিন আগে থেকেই শুরু হয় বাজি ফোটানোর প্রতিযোগিতা, যা চলে বিসর্জনের দিন পর্যন্ত। অনেক সময় এই উল্লাসে ঘটে দুর্ঘটনা, এমনকি সংঘর্ষও। প্রশ্ন হলো, ধর্মের কোথায় লেখা আছে যে শ্যামা মায়ের পূজায় বিকট শব্দে বাজি ফোটাতে হবে? কোথায় বলা আছে যে মাতৃমূর্তির সামনে মদ্যপ অবস্থায় উচ্চস্বরে হিন্দি গান বাজানোই ভক্তির প্রকাশ?
শ্যামা পূজার আসল তাৎপর্য হলো — আত্মার অন্ধকার দূর করা, মনের ভেতরের অশুভকে পরিশুদ্ধ করা। এটি এক আত্মোপলব্ধির পূজা, বাহ্যিক উল্লাসের নয়। অথচ, আমরা এখন পূজার দিনে যতটা না ভক্তি করি, তার চেয়ে বেশি করি কোলাহল, প্রদর্শনী আর প্রতিযোগিতা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো— নবীন প্রজন্ম এই অপসংস্কৃতিকেই ‘ধর্মীয় উৎসব’ হিসেবে দেখছে। তাদের অনেকেই জানেই না পূজার শাস্ত্রীয় নিয়ম বা তাৎপর্য কী। এর দায় শুধু তরুণদের নয়; অভিভাবক ও সমাজের প্রবীণরাও এখানে দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তাঁরা যদি সন্তানদের প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা, আচরণবিধি ও পূজার শুদ্ধ রূপের সঙ্গে পরিচিত করাতেন, তবে হয়তো এ অবক্ষয় ঘটতো না।
আজ প্রয়োজন ধর্মের বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, তার অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝা ও চর্চা করা। পূজা মানে মায়ের প্রতি ভক্তি, সমাজে শৃঙ্খলা, এবং নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। সেই চেতনা ফিরে আসুক প্রতিটি ভক্তের মনে। পূজা হোক শান্তি, আলো ও সৃষ্টির প্রতীক— শব্দদূষণ, মদ্যপান বা অপসংস্কৃতির নয়।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: