সিলেট-১ আসন: শক্তিশালী জামায়াত মোকাবেলায় কর্মীদের ভরসা আরিফ
Led Bottom Ad

সিলেট-১ আসন: শক্তিশালী জামায়াত মোকাবেলায় কর্মীদের ভরসা আরিফ

আশিস রহমান,নিজস্ব প্রতিবেদক

২০/১০/২০২৫ ০৬:৪৯:৪৬

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেট-১ আসনে এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি বিএনপির মনোনয়ন। কিংবা কোন প্রার্থীকে দলীয়ভাবে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়ার বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসছে না। এ অবস্তায় ১৯ অক্টোবর দলীয় মহাসচিবের সাথে সিলেটের ১৯ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঢাকায় তলব করা হয়। তবে সেই সভা থেকে দলীয় মনোনয়ন বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোন সিদ্বান্তে পৌছতে পারে নি দলটি। উপরন্ত মাঠে তৎপর থেকে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রার্থীতা ঘোষণায় এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ১৯ জেলায় সংগঠনের পক্ষে আসন ভেদে প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ২০ মে সিলেট-১ আসনে পূর্ব ঘোষিত প্রার্থী বদল করে নতুন প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমানকে সিলেট-১ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের একক প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। 


প্রচারণায় পিছিয়ে নেই বিএনপি। দীর্ঘদিন থেকে নির্বাচনের লক্ষ্যে মাঠে কাজ করছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্ঠা এবং একজন স্বজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে সুপরিচিত। দলীয় চেয়ারপার্সনের অপর উপদেষ্ঠা ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও দলীয় মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন থেকে। এমনকি তিনি গেল ১১ জুলাই নগরীর বন্দরবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে প্রকাশ্যে সিলেট-১ আসনে নির্বাচনের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সিলেটের মুরুব্বিয়ানসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে দোয়া চেয়ে ইজাজত নিয়ে প্রচার শুরু করেছি।’ 


মাঠের অবস্তান 

সিলেট-১ আসনটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। স্বাধীনতা পরবর্তী এই আসন থেকে যে দল নির্বাচিত হয়েছে, সেই দলই সরকার গঠনে সমর্থ হয়েছে। ফলে এই মিথকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রধান দৃষ্টি থাকে সিলেট-১ আসনের দিকে। সিটি কর্পোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসন। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে সবসময়ই হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়ে থাকে দলগুলো। সর্বশেষ এ আসনের এমপি ছিলো আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। তবে এবার ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৫ আগষ্টের পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। দেড়যুগ আওয়ামী লীগের দখলে ছিল সিলেট-১ আসন। এবার দখলমুক্তির লড়াইয়ে কোন দল বিজয়ী হচ্ছেন- এই নিয়ে ভোটারদের মধ্যে বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। ভোটাররা বলছেন, বিএনপির প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্বান্ত নিলে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি জামায়াত প্রার্থীর বিজয় সম্ভাবনা সহজ হয়ে যাবে।  


আরিফুল হক চৌধুরী

২০১৩ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মরহুম বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করে প্রথম মেয়র হয়েছিলেন বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ফের দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে মেয়র হন। তবে ২০২৩ সালের নির্বাচনে দলের বারণ থাকায় মেয়রপ্রার্থী হননি তিনি। ওই বছরের ২০ মে তিনি ঘোষণা দিয়ে সিটি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। আরিফ প্রার্থী না হওয়ায় সিটি নির্বাচনে মেয়র হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। আরিফুল হক চৌধুরী দু’দফায় মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে ছিলেন নির্বাচিত কাউন্সিলর। সিলেট পৌরসভার কাউন্সিলর দিয়ে তার ‘জনপ্রতিনিধি’র জীবন শুরু। এখনো তিনি সিলেট মহানগরীর অনেকটা অপরিহার্য জনপ্রতিনিধি। সিলেটের উন্নয়নের বরপুত্র মরহুম অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের জামানায় তিনি ছিলেন সিলেটের সবচেয়ে ক্ষমতাধর লোক। নগরের কাঙ্খিত উন্নয়নে আরিফুল হক ছিলেন প্রধান পুরুষ। এখন তিনি মেয়রের পদে নেই। তবে প্রতি সপ্তাহে একবার হলেও তিনি উঠে আসেন আলোচনায়। আলোচ্য ব্যক্তি আরিফুল হক নিজেও বিষয়টিকে বেশ উপভোগ করেন-এমনটি ধারণা নগরের অধিবাসীদের। সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক তাড়াতে যে আরিফুল হক ছিলেন ব্যতিব্যস্ত, তিনিই আবার নতুন যোগ দেওয়া জেলা প্রশাসকের সাথে সিলেটের উন্নয়নে কাজ করছেন হাত মিলিয়ে। জেলা প্রশাসককে সাথে নিয়ে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সার বিরুদ্ধে মাঠে নামেন তিনি। মহানগরীতে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে তার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই নগরবাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সহায়তায় সুফলও পাচ্ছে নগরবাসী। এর পর পরই নামেন ফুটপাত মুক্ত করার অভিযানে। মোট কথা নগর উন্নয়নে তাঁর আপোসহীন ভূমিকা সর্বমহলে প্রশংসার যোগ্য। এর আগে ১১ জুলাই তিনি জুম্মাহ’র নামাজ আদায় শেষে সিলেট-১ আসনে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার কথা জানান। অবশ্য এখানেও তিনি ‘যদি’ ‘তবে’ অপশন রেখে কথা বলেন। যেমনটি তিনি বরাবরই করে থাকেন। 


খন্দকার অবদুল মুক্তাদির

খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। দ্বাদশ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় দলীয় সিদ্বান্ত অনুযায়ী তিনি নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ান। ত্রয়োদশ নির্বাচনেও এই আসন থেকে তিনি একজন শক্তিশালী প্রার্থী। খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের পিতা মরহুম খন্দকার আবদুল মালিক ছিলেন সিলেটে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম।  তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৮ আসন থেকে, ১৯৯১ সালের পঞ্চম ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সিলেটের উন্নয়ন করে সিলেটবাসীর আস্থা অর্জন করতে চান। আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক হিসেবে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে বেশ সুপরিচিত। সিলেটে বিএনপির গ্রুপ কেন্দ্রীক রাজনীতিতেও খন্দকার বলয় বেশ শক্ত অবস্থানে। দলীয় কর্মসূচীসহ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা নিয়ে তিনি কাজ করছেন প্রতিটি পাড়া মহল্লায়। সেইসব কর্মসূচীতে সিলেট-১ আসনে নিজের প্রার্থীতা ঘোষনার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন জোড়ালোভাবে। প্রতি কর্মসূচীতে দলীয় নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও বেশ উল্লেখযোগ্য। তবে সবকিছুর পরও তৃণমূল মানুষের সাথে তিনি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন নি-এমন বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে ভোটারদের আলোচনায়। বিশেষ করে স্থানীয় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী যেভাবে সরব থেকে জনমত গড়ে তুলতে পারেন, সেখানে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির অনেকটাই নির্ভার। 


মাওলানা হাবিবুর রহমান

মাওলানা হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য এবং সিলেট জেলার আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একজন ইসলামী চিন্তাবিদ ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব” হিসেবে তিনি সিলেটে সুপরিচিত। সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট কমিটিরও তিনি চেয়ারম্যান। তাছাড়া রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সিলেট ইউনিটের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।  

হাবিবুর রহমানকে চলতি বছরের মে মাসে দলীয়ভাবে সিলেট-১ আসনে দল থেকে মনোনয়ন ঘোষণা করা হয়। দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা পরবর্তী সিলেট শহরে লিফলেট বিতরণ, পোস্টার ও বিলবোর্ডসহ নানা প্রচারণা শুরু হয়। দলীয় কর্মীরা নগরীর প্রতিটি মহল্লা মহল্লায় প্রতিদিন লিফলেট বিলি করে চলছেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যুক্ত থেকে এই প্রার্থী সিলেটের উন্নয়নে নিজের প্রতিশ্রুতি তোলে ধরছেন। সভা-সমিতিতে হাবিবুর রহমানের উল্লেখযোগ্য বক্তব্য হচ্ছে  “বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষ বাস করে এই দেশে, আমাদের পরিচয় কিন্তু আমরা সবাই বাংলাদেশি। ধর্ম ও গোত্রের নামে বিভক্তি জাতির উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।” তিনি আরও বলেন, গত ১৬ বছরের শাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি এসব কারণে মানুষের ভাগ্য সঠিকভাবে উন্নত হয়নি। এবং এখন একটি ন্যায়-ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। 

সিলেটে জামায়াত ইসলামীর রাজনৈতিক ভোটার কী পরিমান হতে পারে-এমনটি ধারণা করা খুবই কঠিন। তবে উল্লেখযোগ্য ভোটার রয়েছে-এমন তথ্য নেই কারো কাছে। আবার অনেকেই বলেছেন, জামায়াত ইসলামী একটি সুসংগঠিত এবং সুশৃঙ্খল দল। যারা যথাসময়ে নিজেদের অবস্তান খুব ভালোভাবে জানান দিতে সামর্থ রাখে। সবকিছুর পরও ভোটের মাঠে তাদের অবস্তানকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। তবে মাওলানা হাবিবুর রহমান বিষয়ে সাধারণ ভোটাররা দ্বিধা-বিভক্ত। ভোটারদের বক্তব্য অনুযায়ী‘তিনি সিলেটের সমস্যা,সম্ভাবনা ও সঙ্কটে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন নি। বরং নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা হাসপাতাল নিয়ে ব্যস্থ সময় কাটিয়েছেন তিনি। তাছাড়া, বয়স বিবেচনায়ও এই প্রার্থীকে নিয়ে আগ্রহ কম সাধারণ ভোটারদের।


ভোটাররা বলছেন, আলোচনায় উঠে আসা তিন প্রার্থীর মধ্যে নিজ দলের বাহিরে ভোট  কাড়তে সক্ষম একমাত্র আরিফুল হক চৌধুরী। তাদের মতে, আরিফুল হক চৌধুরী, পৌরসভার কমিশনার থেকে দুই দুইবারের নির্বাচিত মেয়র। সে হিসেবে তাঁর নিজস্ব একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। তাছাড়া, সংখালঘু সম্প্রদায়ের একটি বিরাট অংশ আরিফুল হক চৌধুরীকে সমর্থন জানাবে বলে ধারণা তাদের। একই সাথে আদিবাসী সম্প্রদায় সহ বেশকয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথেও সখ্যতা রয়েছে এই প্রার্থীর। 







 


 

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad