রূপালী জলে অপার্থিব রূপকথা: টাঙ্গুয়ার হাওরে জোছনা ছুঁয়ে গেল ‘মলুয়া’

রূপালী জলে অপার্থিব রূপকথা: টাঙ্গুয়ার হাওরে জোছনা ছুঁয়ে গেল ‘মলুয়া’

পূজা বাড়াইক

২৫/০৯/২০২৬ ২২:৫৩:৩৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দিকচক্রবাল ছুঁয়ে নেমে আসা রূপালী আলোর প্লাবন, আর নিচে বিস্তীর্ণ থৈ থৈ জলরাশি। কোনো কৃত্রিম কৃচ্ছ্রতা নেই, নেই আলোকচ্ছটার তোপ—কেবল অনন্ত আকাশ আর জলের ক্যানভাসেই জমে উঠল এক ধ্রুপদী মায়াজাল। চাঁদের আলো আর ঢেউয়ের মৃদু গুঞ্জনের বুকে সুরের লহরি তুলে মঞ্চস্থ হলো মৈমনসিংহ গীতিকার অমর আখ্যান ‘মলুয়া’।

গত শুক্রবার এক মায়াময় পূর্ণিমা সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে আয়োজিত হয় এই অভিনব থিয়েটার পরিবেশনা। উল্লাস ট্রাভেলসের একটি ভাসমান হাউস বোটে ‘থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানি’ উপস্থাপন করে ষোড়শ শতকের কবি চন্দ্রাবতীর সেই বিখ্যাত পালাগাথা। যান্ত্রিক শহরের ভিড় থেকে দূরে, হাওরের হাওয়ায় মিশে গিয়েছিল লোকবাদ্যের ঝংকার, কথকের গম্ভীর উচ্চারণ, নাটকীয় সংলাপ আর উদাস করা লোকনৃত্য। প্রেম, বিরহ, আত্মত্যাগ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীর তেজস্বিতার গল্পে নিমেষেই বিভোর হয়ে পড়েন উপস্থিত দর্শকেরা।

আদি লোকনাট্যের অন্তর্নিহিত রসকে আধুনিক দৃশ্যরীতিতে ফুটিয়ে তোলার এ প্রয়াসে নির্দেশনায় ছিলেন সাইফুল জার্নাল। পরিবেশনার নেপথ্য ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের পালা, পুঁথি কিংবা গাজির গীতের মতো ঐতিহ্যবাহী লোকআঙ্গিকগুলো সময়ের তোড়ে বিলুপ্তির পথে। যা-ও বেঁচে আছে, তা প্রায়শই বিকৃতির শিকার। আমরা থিয়েট্রিক্যাল কোম্পানির মাধ্যমে সেই মূল নির্যাসকে বিশুদ্ধ রূপে আধুনিক দর্শকের সামনে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। হাওরের এই অপার প্রকৃতি আমাদের সেই ভাবনাকে এক অপরূপ মাত্রা দিয়েছে।”

চন্দ্রাবতীর ‘মলুয়া’ নিছক কোনো বিরহ গাথা নয়; এটি সামন্তবাদী শোষণ, অন্যায় আর সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নারীর আপসহীন লড়াইয়ের ইতিহাস। গল্পের নায়িকা ‘মলুয়া’ কেবল কোনো নিষ্ক্রিয় প্রেমিকা নন, বরং ক্ষমতাধরদের অবিচারের মুখেও নিজের সততা, তেজ ও আত্মমর্যাদাকে বাঁচিয়ে রাখা এক অনমনীয় প্রতীক। হাওরের জোছনা রাতে শতাব্দীর পুরোনো এই আখ্যান বর্তমান সময়ের দর্শকের হৃদয়েও ছুঁয়ে গেছে এক গভীর বার্তা—নারীর সম্মান ও সত্যের জয় গান।

প্রচলিত বাণিজ্যিক বিনোদনের সীমানা পেরিয়ে হাওরের বুকে লোকসংস্কৃতির এই চর্চাকে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে মনে করছেন আয়োজকেরা। উল্লাস ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী হাসানুর রহমান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “আমরা চেয়েছি শিকড়ের গান দিয়ে প্রকৃতির এই অপূর্ব উপহারকে বন্দনা করতে। সম্ভবত টাঙ্গুয়ার হাওরের হাউস বোটে এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ থিয়েটার পরিবেশনা। মাটির সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে আনন্দ উদযাপনের এই স্মৃতি বহুদিন বেঁচে থাকবে।”

কুশীলবদের প্রাণবন্ত অভিনয়ে নাটকটিকে জীবন্ত করে তোলেন হাসনাত রিপন, নুসরাত ইরা, সাইদুর শাহীন, শাহরিয়ার সজীব, প্রিয়ম মজুমদার, তাহাদিল আহমেদ, হুমায়রা স্নিগ্ধা, গোপী দেবনাথ, ফরহাদ শামীম, মারিয়া ইয়াসমিনসহ অনেকে।

হাওরের অনন্ত জলধারে ভাসিয়ে দেওয়া মলুয়ার এই সুরযাত্রা এখানেই থামছে না। আগামী ২ অক্টোবর চুনারুঘাট সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের ৩৭ বছর পূর্তি উৎসবে পুনরায় পরিবেশিত হবে এই কালজয়ী লোকগাথা।

নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad