মৌলভীবাজারে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষিকার কাণ্ডে অভিভাবকরা তাজ্জব!
শ্রেণিকক্ষে চক-ডাস্টার হাতে শিক্ষার্থীদের মগজে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কথা। কিন্তু তার বদলে মিষ্টি হাওয়ায় টেবিলে মাথা গুঁজে খোদ শিক্ষিকাই চললেন স্বপ্নের দেশে! মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ক্লাস চলাকালে এক সহকারী শিক্ষিকার এমন 'ঘোর লাগা' ঘুমের দৃশ্য এখন নেটপাড়া থেকে শুরু করে চায়ের কাপে তুমুল আলোচনার খোরাক। ঘটনার আলোকচিত্র আর ভিডিও চাউর হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অভিভাবক থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা।
চাঞ্চল্যে ঘেরা এই ঘটনাটি ঘটেছে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের বনগাঁও-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অভিযোগের তির সহকারী শিক্ষিকা নবনিতা সিনহার দিকে। পাঠদানের ব্যস্ত সময়ে কমলমতি শিশুদের কচি-কাঁচা হৈচৈকে 'লোরি' বানিয়ে টেবিলে মাথা রেখে তিনি কাদা-ঘুম দেন বলে অভিযোগ। আর ওদিকে? অভিভাবকের তদারকি ছাড়া শিক্ষার্থীরাও মেতে ওঠে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো হইচই আর কান্ডকারখানায়।
ঘটনাক্রমে সংবাদসংগ্রহে আসা কয়েকজন সাংবাদিকের চোখ চড়কগাছ! তাঁরা দেখতে পান, শ্রেণিকক্ষের সামনের দরজায় দীর্ঘ পাঁচ-ছয় মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেও শিক্ষিকার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে না মোটেও। শেষমেশ কচিকাঁচাদের কানফাটা চিৎকার আর চেঁচামেচির তোড়জোর ভাঙল সেই 'ঘুমের ঘোর'। ধড়ফড় করে চোখ মেলে শেষমেশ শ্রেণিকক্ষেই অবস্থান নেন তিনি।
সহকর্মী শিক্ষকরাও চটেছেন এমন কান্ডে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সহকারী শিক্ষিকা আক্ষেপ করে বলেন, "পড়াশোনার সময় এমন আয়েশি ঘুম একেবারেই অনুচিত! দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ঘুমে বিভোর ছিলেন, আর ওদিকে বাচ্চারা চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল। ক্লাসরুমে শিক্ষক এভাবে ঘুমালে শিক্ষার বারোটা বাজতে বেশি সময় লাগে না।"
ঘটনার সময় যেন আগুনে ঘি ঢালল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিতেন্দ্র কুমার সিংহের অনুপস্থিতি ও তাঁর দেওয়া গোলমেলে তথ্য! ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাফা সাফ জানান, 'বিদ্যুৎ বিল দিতে বাজারে এসেছেন।' কিন্তু কৌতূহলের বিষয় হলো, অন্য এক সহকারী শিক্ষকের দাবি—প্রধান শিক্ষক গেছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসে দাপ্তরিক কাজে! দুই শিক্ষক-কর্মকর্তার দুই মেরুর বয়ানে ঘটনায় যুক্ত হয়েছে নাটকের নতুন অঙ্ক।
এদিকে, মাঝপথে 'নিদ্রাবিলাস' নিয়ে জানতে চাওয়া হলে সহকারী শিক্ষিকা নবনিতা সিনহা একেবারে মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
ঘটনার থৈ থৈ আলোড়নে ফুসে উঠছেন অভিভাবকরা। তাঁদের স্পষ্ট কথা—"সন্তানদের মানুষ করার আশায় স্কুলে পাঠাই, কিন্তু শিক্ষকই যদি ক্লাসে ঘুমিয়ে স্বপ্ন বোেনেন, তবে বাচ্চারা শিখবে কী? শরীর খারাপ লাগলে প্রধান শিক্ষককে জানিয়ে ছুটি নেওয়ার সহজ আইনি পথ ছিল। এভাবে দায়িত্ব ফাঁকি দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না উপজেলা প্রশাসনও। কমলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুর রহিম বাবর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, "শ্রেণিকক্ষ কোনো বিশ্রামের জায়গা নয়। অসুস্থতা থাকলে ছুটির বিধান আছে। কিন্তু ক্লাসে ঘুমানোর এই খামখেয়ালি কোনো নিয়মেই পড়ে না। তদন্ত করে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"
একই সুরে সুর মিলিয়েছেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "স্কুল চলাকালে ক্লাসে ঘুমানোর কোনো সুযোগ নেই। ওই শিক্ষিকাকে তলব করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।" শিক্ষা ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু মাধ্যমিক নয়, এখন থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও কড়া নজরদারি ও ঝটিকা পরিদর্শন জোরদার করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
শাহিন আহমেদ/ নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: