সিলেটে এমসি কলেজ ধর্ষণ মামলার রায়: ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন

৪ জন খালাস

সিলেটে এমসি কলেজ ধর্ষণ মামলার রায়: ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের যাবজ্জীবন

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

১৪/০৭/২০২৬ ১৪:৫৯:২৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। এছাড়া রায়ে আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি চারজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন সাইফুর রহমান। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম রনি ও অর্জুন লস্কর। অন্যদিকে, অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমান। সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তবে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, “এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সরাসরি সাক্ষী দেয়নি। ভিকটিমও আসামিদের শনাক্ত করেননি। অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।”

এর আগে, সকালে কড়া নিরাপত্তায় মামলার আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় আসামিরা গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “আমরা ধর্ষণকারী না ভাই, আমরা ধর্ষণ করিনি। রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে আমাদের মামলার আসামি করা হয়েছে। ভিকটিমও আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেনি।” আলোচিত এই মামলার রায় উপলক্ষে সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমকর্মী ও উৎসুক জনতার ভিড় লক্ষ করা গেছে।

সে রাতে যা ঘটেছিল:

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামীর সাথে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন ওই তরুণী (২০)। ফেরার পথে টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে পাশ্ববর্তী দোকানে প্রবেশ করেন তার স্বামী। এই সময়ে ৫/৬ জন তরুণ এসে তাদের জিম্মি করে প্রাইভেটকারসহ বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়।

সেখানে স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রেখে ওই তরুণীকে ছাত্রাবাসের ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। পরে তাদের টাকা-পয়সা ও প্রাইভেটকার রেখে দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে এসে তরুণীর স্বামী বিষয়টি পুলিশকে জানান। তবে অভিযুক্তরা তৎকালীন শাসকদলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় প্রথমে ছাত্রাবাসে প্রবেশে গড়িমসি করে পুলিশ। এই সুযোগে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে রাতভর ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী বাদী হয়ে মহানগর পুলিশের শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র‍্যাব। গ্রেপ্তারের পর তাদের রিমান্ডে নেওয়া হলে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করেন। পরবর্তীতে আসামিদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় আটজনের মধ্যে ছয়জনের ডিএনএ-র মিল পাওয়া যায়।

অভিযোগপত্র ও বিচার প্রক্রিয়া:

২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর এই ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর পুলিশের শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য। অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে দল বেঁধে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আর রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঘটনার পর ৮ জনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে ও তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করে। এছাড়া ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর ও রনিকে আসামি করে পৃথক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিন আইনি জটিলতা ও দুই মামলার (ধর্ষণ ও অস্ত্র মামলা) একসাথে বিচার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর, গত বছরের মে মাসে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। মামলায় ভুক্তভোগী গৃহবধূ, তার স্বামী, ম্যাজিস্ট্রেট, তদন্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সহ মোট ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আজ এই রায় ঘোষণা করলেন আদালত।

আর আর

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad