বিপর্যয়ের মুখে পরিবেশ
সিলেটের বনাঞ্চলে বাড়ছে মানুষের আগ্রাসন, কমছে বন্যপ্রাণী
একসময় খাবার সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসতো বিষধর সাপ অজগর। এমন ঘটনা সিলেটে ছিল অহরহ। চিতাবাঘও দেখা গেছে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে। তাছাড়া, লজ্জ¦াবতী বানর, হনুমান লোকালয়ে দেখা গেছে-এমন খবর ছিল অহরহ। অবশ্য এখন সেই সব প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কালে-ভদ্রে দু-একটার দেখা মিলে,এমনটি বলারও জো নেই এখন। মানবরাজ্যের দানবের হানায় উজার হচ্ছে সিলেটের বনাঞ্চল। দানবদের আধিপত্য বেড়ে যাওয়ায় কমে গেছে পশুদের রাজত্ব। ফলে ধীরে ধীরে বনের বিরল প্রজাতিগুলো হচ্ছে বিলুপ্ত। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর।
পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, মানুষের আগ্রাসন, লোভে বা অপরিকল্পিত নগরায়নে উজাড় হচ্ছে বন। বনাঞ্চলের সঙ্গে কমছে প্রাণীর সংখ্যাও। খাদ্য ও বাসস্থানের সংকট, অবৈধ শিকার, পাচার, কীটনাশকের অতি ব্যবহারের মতো নানা কারণে প্রতি বছরই পৃথিবী থেকে কোনো না কোনো প্রাণী বিলুপ্ত হয়।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, সিলেটে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭১৪ একর জমি বনবিভাগের। এর মধ্যে প্রায় ৫৮ হাজার ভুমিই চলে যায় বেদখলে। আবার নগরায়নের ফলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নতুন করেও বেদখল হচ্ছে অনেক জমি। প্রায় এক তৃতীয়াংশ জমি বেদখলে থাকলেও তা উদ্ধারে বনবিভাগের তৎপরতা অনুল্লেখযোগ্য। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একশ্রেণীর প্রভাব প্রতিপত্তিশালী লোকজন অবৈধভাবে দখল করে জনবসতি স্থাপনের কারণে বিগত অর্ধশত বছরে সিলেট বনাঞ্চলের পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট বনাঞ্চলের আয়তন ১ হাজার ১৫২ বর্গ কিলোমিটার থেকে মাত্র ১৩৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। যা’ বন্যপ্রাণি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
লাউয়াছড়ার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এক সময়কার নির্জন নিস্তব্দ এই বনাঞ্চলে গাড়ি থেকে দিনের আলোতে দেখা যেত ভয়ঙ্কর সব প্রাণী। কিন্ত নিত্যকার শ’য়ে শ’য়ে গাড়ির বহর আর হর্নের উচ্চ শব্দে লাউয়াছড়া থেকে অধিকাংশ প্রাণী এখন উধাও। বড়লেখা ও জুড়ী বনাঞ্চলে ও হবিগঞ্জ জেলার রেমা কেলেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বিগত বছরগুলোতে চশমাপরা হনুমান এর মৃত্যুর খবর বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রকাশও পেয়েছে।
বনাঞ্চলে রয়েছে প্রভাবশালী চক্রের আধিপত্য। এই চক্র বনাঞ্চলের বিভিন্ন মূল্যবান গাছ,বাঁশসহ কেটে উজাড় করেছে। সঙ্ঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী বনাঞ্চল দখল করে বসতি স্থাপন, রিসোর্ট ও চা বাগান তৈরি, বনজ সম্পদ ধ্বংস করার কারণে ধ্বংশ হচ্ছে বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্য বনাঞ্চল। এ তালিকায় সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জের বাহুবল, নবীগঞ্জ, চুনারুঘাট, মাধবপুর, হবিগঞ্জ সদর,মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার সদর, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ সদর, সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট উপজেলায় বন বিভাগের বেশির ভাগ জমিই দখল করে নিয়েছে দখলদাররা। দখল করে নেয়া এসব জমির গাছপালা নিধন, শ্রেণী পরিবর্তনসহ কোথাও কোথাও মাটি কেটে বা ভরাট করে ভূমিরূপ পরিবর্তন করে ফেলারও অনেক তথ্য প্রমান পাওয়া গেছে।
এদিকে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গলের একটি ফেসবুক পেইজ থেকে জানা যায়, বনভূমি দখলের কারণে বন্যপ্রাণীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে খাবারের সংগ্রহে লোকালয়ে বেরিয়ে পড়ে। গেল দীর্ঘ দেড় যুগে শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও তার আশপাশ এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন রকমের প্রায় সাত শতাধিকের উপরে বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে স্থানীয় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন বন্য প্রাণীদের লোকালয়েও দেখা যায় না।
প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের তথ্য বলছে, গেল ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অন্তত ১৯ প্রজাতির প্রাণী। প্রতিবেদনে সর্ব্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীদের মধ্যে শকুনের নাম উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়- এক সময় দেশে সাত প্রজাতির শকুন ছিল। কিন্তু এর মধ্যে রাজ শকুন পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রায় ১০/১২ বছর আগেও সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানের রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় চিতা বাঘ দেখা যেত। এখন চিতা বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে প্রাণীটি চরম সংকটাপন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ, ৪০-৫০ বছর আগেও চিতাবাঘের আক্রমণে মানুষ আহত বা নিহত হওয়ার খবর রয়েছে। কিন্তু এখন জঙ্গলেও চিতা বাঘের দেখা পাওয়া দুষ্কর।
বিলুপ্ত বন্য প্রাণীদের মধ্যে আরও রয়েছে উল্লুক। বনাঞ্চলে বড় বড় গাছ কেটে ফেলা, খাদ্য সংকট, অবৈধভাবে উল্লুক শিকারের কারণে বনগুলো থেকে এই প্রাণীর সংখ্যা কমছে। উল্লুক যেহেতু বড় বড় গাছের মগডালে থাকে, লাফ দিয়ে যাতায়াত করে। সেখানে এরকম গাছ কেটে ফেলা হলে তাদের বাসস্থানের পরিবেশে নষ্ট হয় যায়, চলাফেরা সীমিত হয়ে যায়। আবার তারা যেসব খাবার খায়, সেই গাছগুলো কেটে ফেলা হলে খাবারের জন্যও সংকট তৈরি হয়। ফলে অনেক বন থেকে প্রাণীটি হারিয়ে গেছে।
সিলেট এবং মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বনে চায়না প্রজাতির বনরুইয়ের দেখা মেলে। তবে তা বর্তমানে বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে। মহা বিপন্ন হিসেবে আছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ পরিষদ (আইইউসিএন)। অবাধ শিকার, পাচার, বাসস্থান নষ্টের কারণে এখন তারা মহা বিপন্ন তালিকাভুক্ত। এগুলো ছাড়াও বনগরু, বনবিড়ালসহ বিভিন্ন ধরনের ভোঁদড়, বানর, কচ্ছপ বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মেছো বাঘ বা মেছো বিড়ালও এখন একটি সংকটাপন্ন প্রাণী।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হুমায়ুন কবির বলেন, লোকবল সংকটের কারণে বনের জমি সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়া সম্ভব হয় না। এ সুযোগে অনেকে দখল করে ফেলে। এরপর আমরা উদ্ধারে গেলে তারা আদালতে চলে যায়। ফলে তাৎক্ষনিকভাবে উদ্ধার করা যায় না। তার পরও আমরা প্রায়ই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে জমি উদ্ধার করি।
হবিগঞ্জের সহকারি বন সংরক্ষক কারেক রহমান বলেন, অবশ্যই আগের তুলনায় প্রাণীর সংখ্যা কমে গেছে। আসলে বন থাকবে বন্যদের জন্য। সেখানে মানুষের আগ্রাসন নি:সন্দেহে বনাঞ্চলের ক্ষতিকারক। তবে বন বিভাগ বারবারই বনাঞ্চল রক্ষায় কাজ কওে যাচ্ছে।
সিলেটের পরিবেশ আন্দোলনে ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় দুই দশক ধরে কাজ করে যাচ্ছেন আব্দুল করিম কিম। তিনি বলেন, বনাঞ্চল ধ্বংস ও মানুষের আগ্রাসী আচরণের কারণে সিলেট বিভাগ থেকে প্রতিনিয়ত কমছে বন্যপ্রাণী। চোরা শিকারীরা বন্যপ্রাণী শুধু শখের বশে শিকার করে না, চোরাচালানের উদ্দেশ্য নিয়েও বন্যপ্রাণী ফাঁদ পেতে আটকে করে। তাছাড়া খাবারের অভাবে লোকালয়ে আসা বন্যপ্রাণীকে পিটিয়ে হত্যার প্রবনতাতো রয়েছেই। এ অবস্থায় সিলেটের বনাঞ্চল থেকে বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: