সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকে কেন্দ্র করে ‘লুটপাটের আখড়া’
Led Bottom Ad

কাঠগড়ায় প্রশাসন ও পাউবো

সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকে কেন্দ্র করে ‘লুটপাটের আখড়া’

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

১০/০৫/২০২৬ ১৯:২৯:৩০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার যোগসাজশে ‘লুটপাটের আখড়ায়’ পরিণত হয়েছে এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং নিম্নমানের বাঁধ নির্মাণের ফলে আগাম পাহাড়ি ঢলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল এখন হুমকির মুখে।


​ইতিমধ্যেই এই দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সিলেট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে পাউবো ও প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন মো. মোছাদ্দেক আলী নামের এক ব্যক্তি।


​লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কাই করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃত কৃষক ও জমির মালিকদের নিয়ে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তুষ্ট করতে পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে বাঁধ নির্মাণের শুরুতেই দুর্নীতির পথ প্রশস্ত হয়।


​চলতি বছর সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই কাগজে-কলমে সমাপ্ত দেখানো হয়েছে।


সরেজমিনে দেখা গেছে, ​বাঁধে বাঁশ ও ঘাস লাগানোর নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। ​অনেক স্থানে নদী থেকে বালু ও কাদা তুলে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ​পুরোনো বাঁধের মাটি কেটে নতুন কাজের বিল তোলার অভিযোগ উঠেছে। ​প্রয়োজনীয় ক্লোজার (ভাঙন মুখ) খোলা রেখেই প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে।


​জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যেখান থেকে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু বাঁধের ভঙ্গুর দশা এবং অসময়ের বৃষ্টিতে অনেক এলাকার জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের হাহাকার শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন, বাঁধের নামে সরকারি টাকা লুট হয়েছে, আর পানিতে ডুবেছে আমাদের সারা বছরের অন্ন।


​বাঁধ নির্মাণে এমন লুটপাটের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। তাদের দাবি, প্রতিবছরই বাঁধের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। সংগঠনগুলো অবিলম্বে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছে।


​অভিযোগের বিষয়ে পাউবো কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বরাবরের মতোই প্রতিকূল আবহাওয়ার অজুহাত দিচ্ছেন। তবে দুদকের কাছে জমা পড়া অভিযোগে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকায় এবার মাঠ পর্যায়ে কড়া তদন্তের আশা করছেন হাওরবাসী।


হাওরের ফসল রক্ষা কেবল একটি সরকারি প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। এই প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করা মানে কৃষকের পেটে লাথি মারা। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামীতে হাওরাঞ্চল এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হতে পারে।

প্রীতম দাস/ ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad