পালকিছড়ার টিনের ঘরে তার উত্তর
“সখি, ভালোবাসা কারে কয়?”
রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন রেখেছিলেন—“সখি, ভালোবাসা কারে কয়?”- কুলাউড়ার পালকিছড়া চা বাগানের এক টিনের ঘর থেকে যেন ভেসে আসে তার উত্তর—ভালোবাসা মানে কারও হাত শক্ত করে ধরা, যখন দুনিয়া হাত ছেড়ে দেয়।
৪৫ বছরের বাসমতি রানী রবিদাস। জন্মান্ধ স্বামী রামনারায়ণ রবিদাস। গত ২৫ বছর ধরে তিনি শুধু স্ত্রী নন, স্বামীর চোখ। আর রামনারায়ণ—তিনি শুধু স্বামী নন, বাসমতির আশ্রয়।
একসময় এলাকার মানুষ বাসমতিকে ‘পাগলী’ বলত। অন্ধ এক মানুষের প্রেমে পড়েছিলেন বলেই নাকি তিনি পাগল! পরিবার তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। একইভাবে রামনারায়ণকেও বলা হয়—“এই সম্পর্ক মানা যায় না।” দুজনেই হয়ে যান আশ্রয়হীন।
তারপর শুরু হয় পথচলা—একসঙ্গে, একেবারে শূন্য থেকে।
ভোরে ঘুম ভাঙে বাসমতির। নাস্তা বানানো, স্বামীকে স্নান করানো, পোশাক পরানো—সবশেষে তার হাত ধরে বেরিয়ে পড়া। বাজারে বাজারে ঘোরা, মানুষের দয়ার অপেক্ষা। সন্ধ্যায় ফিরে আসা ক্লান্ত শরীর নিয়ে, কিন্তু একটুখানি শান্তি নিয়ে—আজও তো পাশাপাশি আছি।
রামনারায়ণ বলেন,-“আমার মতো মানুষকে কেউ ভালোবাসতে পারে—এই ভাবনাটাই আমাকে বাঁচায়। তার কাঁধে হাত রাখলেই পথ পাই।”
দুই সন্তানের জন্ম তাদের জীবনে আলো এনেছিল। কিন্তু অভাবের আঁধার ঘন ছিল। অনেক রাত কেটেছে সন্তান উপোস ঘুমিয়ে। বাসমতির বুকেও কখনো দুধ শুকিয়ে গেছে অপুষ্টিতে। তবু কেউ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেননি।
স্বপ্ন ছিল—একদিন ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখবেন। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কিনেছিলেন একটি অটোরিকশা। ভেবেছিলেন, বড় ছেলে চালাবে, সংসারে ফিরবে সম্মান।
কিন্তু গত ৩১ ডিসেম্বর ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখেন—তালা ভাঙা, অটোরিকশা নেই। যেন জন্মান্ধ মানুষের জীবনেও নেমে আসে নতুন এক অন্ধকার।
কাঁপা গলায় রামনারায়ণ বলেন, “ভাবছিলাম আর ভিক্ষা করব না। কিন্তু ভরসাটাও চলে গেল।”
পাশে দাঁড়িয়ে বাসমতি আঁচল দিয়ে চোখ মুছেন। তবু তার কণ্ঠে ভাঙন নেই—“সে দেখতে পায় না ঠিকই, কিন্তু কোনোদিন আমার হাত ছাড়েনি।”
পালকিছড়ার সেই টিনের চালার নিচে বসে বোঝা যায়—ভালোবাসা মানে বড় বাড়ি নয়, প্রাচুর্য নয়, সামাজিক স্বীকৃতিও নয়। ভালোবাসা মানে প্রতিকূলতার ভেতরেও একে অন্যকে আঁকড়ে থাকা।
রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নের উত্তর হয়তো বইয়ের পাতায় নয়, বাসমতি আর রামনারায়ণের সংসারেই লেখা—ভালোবাসা মানে চোখে দেখা নয়, হৃদয়ে দেখা।
ভালোবাসা মানে হারিয়ে গেলেও হাত না ছাড়া।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: