‘১৭ বছর কাজ হয়েছে কাগজে, নদীতে নয়’
উন্নয়নের ঢাকঢোল পেটানো হয়েছে বছরের পর বছর। উদ্বোধনী ফলক বসেছে, ফিতা কাটা হয়েছে, বিল পরিশোধ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সিলেটের বিয়ানীবাজার যেন উন্নয়নের এক নির্মম ব্যঙ্গচিত্র। গত ১৭ বছরে সরকারি কোষাগার থেকে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় হলেও নাগরিক জীবনমানের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। উল্টো শহর ও গ্রামজুড়ে বেড়েছে ভোগান্তি, অব্যবস্থাপনা আর ক্ষোভ।
সরকারি দপ্তরের নথি ও প্রকল্প বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যয়ের সিংহভাগ গেছে সড়ক খাতে। অথচ সেই সড়কই আজ বিয়ানীবাজারবাসীর প্রধান দুর্ভোগ। একই সড়কে দুই–তিন বছরের ব্যবধানে একাধিকবার কার্পেটিং হয়েছে, নিয়মমাফিক বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টিতেই সেসব সড়ক খানাখন্দে ভরে যায়—যেন উন্নয়ন নয়, কেবল অস্থায়ী রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।
মুড়িয়া ইউনিয়নের বড়দেশ গ্রামে কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতু আজ উন্নয়ন ব্যর্থতার প্রতীক। সেতু আছে, কিন্তু নেই সংযোগ সড়ক। স্থানীয়রা ব্যঙ্গ করে একে বলেন, ‘হাওয়ায় ঝুলে থাকা উন্নয়ন’। প্রশ্ন উঠেছে—কার প্রয়োজনে, কোন পরিকল্পনায় এমন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে?
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও স্বীকার করছেন কাজের নিম্নমানের কথা। তিলপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হোসেন আহমদ বলেন, “ঠিকাদারি সিন্ডিকেট আর নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে কাজ টেকসই হচ্ছে না। অনেক সময় সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ করানো হয়, যাদের ওপর কার্যত কোনো নজরদারি নেই।”
পৌর এলাকায় ড্রেনেজ, ফুটপাত ও স্ট্রিটলাইট উন্নয়নে শত কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও শহরবাসীর দুর্ভোগ কমেনি। নালা আছে, কিন্তু পানি যাওয়ার পথ নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পৌর এলাকা জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়ে। প্রথম শ্রেণির পৌরসভার কর দিয়েও মানুষ পাচ্ছে তৃতীয় শ্রেণির সেবা।
ক্ষোভের সঙ্গে বিয়ানীবাজার শহরের ব্যবসায়ী আতিক মিয়া বলেন, “কর দিতে আমাদের দেরি হলে নোটিশ আসে। কিন্তু বছরের পর বছর দুর্ভোগ সহ্য করলেও আমাদের দেখার কেউ নেই।”
সবচেয়ে বিতর্কিত খাত হয়ে উঠেছে নদীভাঙন রোধ প্রকল্প। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর তীর সংরক্ষণের নামে জিওব্যাগ ও ব্লক বসাতে বড় বরাদ্দ এলেও বাস্তবে প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এক সাবেক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এটা নদী শাসন নয়, বরাদ্দ শাসন। কাজ হয়েছে কাগজে, নদীতে নয়।”
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গত দেড় দশকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বহু ভবন নির্মিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংকটে বিদ্যালয়গুলো কার্যত অচল, আর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকায় মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাচ্ছে না। ভবন আছে, সেবা নেই—এটাই বাস্তবতা।
বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি সজীব ভট্টাচার্য বলেন, “পরিকল্পনাহীন প্রকল্প, রাজনৈতিক প্রভাব আর দায়মুক্তির সংস্কৃতি এই এলাকার উন্নয়নকে ধ্বংস করেছে।”
শিক্ষাবিদ আলী আহমদের মতে, “দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জবাবদিহির অভাবই বিয়ানীবাজারকে এই চক্রে আটকে রেখেছে।”
১৭ বছরে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি মানুষের জীবনমান না বদলায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই উন্নয়ন কার জন্য? আর এর দায় কে নেবে?
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: