মাদরাসায় শিকলে বেঁধে শাসন-ভালো লক্ষণ নয়
বলা হয় শিক্ষার্থীরা ফুলের মতো। সেই ফুল গুলো পরিচর্যা করতে হয় গভীর মমতা ও ভালোবাসায়। দায়িত্ববোধ থেকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হয় যথাযথভাবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ফুলগুলো ফোটার আগেই ঝড়ে পড়বে নি:সন্দেহে। অথচ একটু ত্যাগ এবং পরিশ্রম বদলে দিতে পারে বাগানের দৃশ্য। এ ক্ষেত্রে পরিচর্যাকারীকে হতে হয় একই সঙ্গে কুশলী ও সদা-সতর্ক। কারণ, চারাগাছ ও শিশুর পরিচর্যা এমনই নাজুক যে, সামান্য অবজ্ঞা ও অবহেলায় এবং সামান্য অমনোযোগিতা ও অসতর্কতায় উভয়ের জীবনে নেমে আসে চরম সর্বনাশ। শিক্ষাঙ্গণ হচ্ছে সেইরকম এক একটি ফুলবাগান। আর শিক্ষার্থীরা সেই অঙ্গণের এক একটি না ফোট ফুল। শিক্ষাঙ্গণের শিক্ষকরাই সেই ফুলবাগানের রক্ষক। সেই শিক্ষাঙ্গণ হোক সরকারি,বেসরকারি,প্রাইভেট কিংবা মাদরাসা। প্রত্যেক অভিভাবকই নিজ শিশুদের ভবিষ্যত নির্মানের জন্য নির্ভয়ে তোলে দেন শিক্ষাঙ্গণে। তবে শিক্ষাঙ্গণে যখন শিক্ষার্থীর পায়ে শিকল বেঁধে শাসন করা হয়, সেই চিত্র আমাদের বুকে এসে আঘাত করে। প্রশ্ন উঠে শিক্ষাঙ্গণের শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীলদের বিবিধ কর্মকাণ্ড নিয়ে। শিকলে বেঁধে শিক্ষার্থী শাসনের এমন ঘটনাটি ঘটে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের জামিয়া ইসলামিয়া দেওয়ানগঞ্জ মাদ্রাসায়। বিষয়টি প্রথম সিলেটসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে গুরত্বের সাথে প্রকাশ হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম আরাফাত। সে উপজেলার নওধার গ্রামের হবিকুল মিয়ার ছেলে এবং ওই মাদরাসার নূরানী ২য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। আরাফাতের পায়ে লাগানো লোহার শিকলের ওজন প্রায় ৫ কেজি বলে সংবাদে প্রকাশ।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী গেল ১৯ জুন বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ওই ইউনিয়নের গাছতলা বাজারের উত্তরপাশে আরাফাতের এমন অসহায় অবস্থা নজরে আসে। স্থানীয়রা আরাফাতের এমন অবস্থা দেখে কথা বলতেই চাইলেও সে ভয়ে কিছু না বলে দ্রুত বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। পথিমধ্যে তার বাবার সাথে দেখা হয় আরাফাতের। কিন্তু বারবার জিজ্ঞেস করার পরেও বাবার কথার জবাব দিতে পারছিল না। আরাফাতের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ ষ্পষ্ট। বাবার আশ্বাসে আরাফাত কিছুক্ষণ পর জানায়, ওইদিন দুুপুরে মাদ্রাসার শিক্ষক সাঈদ হাসান অরফে রিপন তার পায়ে এই শিকল পড়িয়েছে। বিষয়টি জানার পর এমনটি কেন করা হয়েছে তা জানতে আরাফাতের বাবা আরাফাতকে নিয়ে মাদ্রাসায় যান।
অভিযুক্ত শিক্ষক সাঈদ হাসান বলেন, আরাফাত খুব দুষ্টুমি করে আর পালিয়ে যায়। সে আমার গ্রামের সম্পর্কে ভাতিজা হওয়ায় শাসন করতে গিয়ে শিকল লাগিয়েছিলাম। আমার এমনটি করা উচিত হয়নি। এ জন্য আমি দুঃখিত।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি আশরাফ আলী এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ওই শিক্ষক আমার অজান্তে প্রতিষ্ঠানের নিয়বহিভূর্ত কাজ করেছে। ওই শিক্ষক (সাঈদ) চরম অন্যায় ও ভুল করেছে। সেই ভুলের জন্য তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আল্লাদ মিয়া বলেন, ওই শিক্ষককে বহিস্কার করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধ্যক্ষকে বলা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিষয়টি দু:খ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনবে না। এটি কারো কাম্যও হতে পারেনা। প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ। ঘৃণ্য এই শাসনব্যবস্থা কোনমতেই শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। শিশুকে শাসন করার প্রক্রিয়া কী হতে পারে, সে সম্পর্কে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের জনৈক অধ্যাপক জানান, শাসন করা শব্দটি নির্ভর করছে কোন ঘটনা বা পরিপ্রেক্ষিতে তা ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে শাস্তি দিলে শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। তার চেয়ে তাকে বোঝাতে হবে কোন কাজটি ভালো আর কোনটি মন্দ। নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে ভালো-মন্দের পার্থক্য শিশুর মনস্তত্ত্বে ঢুকিয়ে দিতে পারলে সে নিজেই বুঝতে পারবে কোনটি অন্যায়। তাহলে অন্যায় করা বা মিথ্যা বলার মতো কাজ থেকে সে নিজেকে দূরে রাখবে।
শিশু তার পরিবারের কাছ থেকেই আচরণ শেখে উল্লেখ করে ওই অধ্যাপক বলেন, তাকে আচরণ শেখাতে কিছু প্যারেন্টিং টেকনিক অনুসরণ করা যেতে পারে। তার কাছ থেকেই জানা গেল, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডায়না বামরিন্ডের মতে, সন্তান পালনের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো অথরিটেটিভ প্যারেন্টিং। এই পদ্ধতিতে শিশুকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং তার মতামতের মূল্যায়ন করা হয়। যেটি তার নৈতিকতা বিকাশে সাহায্য করে। এতে শিশুর ইতিবাচক কাজকে পুরস্কৃত করা হয়।
শিক্ষাঙ্গণে চাই শিশুর উপযোগী ইতিবাচক পরিবেশ। যে পরিবেশে শিশু বেড়ে উঠবে আনন্দের সিঁড়ি বেয়ে। শাসনও থাকবে। তবে তার প্রয়োগ হিসেবে বেত্রাঘাত, নির্যাতন কিংবা লোহার শিকলে নয়। পদ্বতিগত প্রয়োগই শিক্ষার্থীকে নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে ইতিবাচক পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: