হেমন্তের সৌরভে নবান্নের আমন্ত্রণ
Led Bottom Ad

হেমন্তের সৌরভে নবান্নের আমন্ত্রণ

দীপ্ত বৈষ্ণব

১৭/১১/২০২৫ ১৬:৩৩:৪১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হেমন্তের প্রভাতে ঘাসের ডগায় আর ধানের শিষের মাথায় টলমল করে থাকে স্বচ্ছ শিশির, যেন মুক্তোর দানা। নতুন কুয়াশা ছুঁয়ে যায় আমনের দিগন্তজোড়া মাঠ থেকে কৃষাণীর রসুইঘর পর্যন্ত। চারদিকে হেমন্তের ধূসর-সোনালি আলোয় মোড়া এক মায়াময় আবহ। দুপুর জুড়ে সোনাঝরা রোদ, আর অখণ্ড বিকেলের নীল আকাশে গাঙচিলের উড়াউড়ি—সব মিলিয়ে আমনের ঘ্রাণে নবান্নের আগমনী বার্তা জানান দেয় হেমন্তী প্রকৃতি।


সিলেটের মাঠে মাঠে দোল খাওয়া সোনালি ধানের শীষ যেন কৃষক-কৃষাণীর মুখে এনে দেয় স্বপ্নভরা হাসি। দক্ষিণ–পশ্চিম সিলেটের ডলিয়া ও নালিয়া গ্রামের কৃষক আবুল বাছিরের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানালেন, “এ বছর ধান ভালো হয়েছে। আরও কয়েক দিনের মধ্যেই কাটাকুটি শুরু হবে।” মাঠ সাজানো নতুন ফসলের আনন্দে প্রকৃতি যেন নিজেই প্রস্তুত নবান্ন উৎসবের জন্য।


দিনের আয়ু কমে আসছে, সন্ধ্যার পর কুয়াশার আলতো চাদরে ঢেকে যাচ্ছে প্রকৃতি। সেই সঙ্গে বাড়ছে শীতের স্পর্শ। এ সময়ই ঘরে ঘরে শিশুরা মাকে প্রশ্ন করে— “মা, ধান পেঁকে গেছে তো? পিঠেপুলি কবে বানাবে?” এই নিষ্পাপ কৌতূহলই যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন নবান্ন উৎসবের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য।


একসময় বাংলার গেরস্থ পরিবারে নবান্ন ছিল অন্যতম সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। আজ শহুরে জীবন ও পরিবর্তিত সময়ের ভিড়ে সেই আমেজ কিছুটা ফিকে হলেও বাংলার কৃষিজীবনের গভীরে এখনও বেঁচে আছে এই আনন্দ-উৎসব। নতুন ধানের গন্ধে উঠোন মৌমৌ করলে, ঘরে উঠলে নতুন চাল—তখনই নবান্নের প্রকৃত রূপ ধরা দেয়।


ভাষা অনুযায়ী ‘নবান্ন’ মানেই ‘নতুন অন্ন’। হেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দেই আবহমান বাংলায় অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনে এই উৎসব পালিত হতো। ‘অগ্র’ মানে ‘প্রথম’, আর ‘হায়ণ’ মানে ‘মাস’। ধারণা করা হয়, কোনো একসময় অগ্রহায়ণই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস। হাজার বছরের ঐতিহ্যে নবান্ন আজও বাংলার অন্যতম অসাম্প্রদায়িক, প্রাচীনতম এবং কৃষিভিত্তিক উৎসব।


এই উৎসবের সুর জুড়ে আছে বাংলার মাটি ও ফসলের সঙ্গে চিরবন্ধন। তাই নবান্ন মানে নতুন চালের ভাত, পিঠা, চিড়া, মুড়ি–মুড়কির ভোজনোৎসব। ধান উঠলে গৃহস্থের উঠোনে যে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে—সেই গন্ধই যেন ঘরে ঘরে বলে যায়, “নবান্ন এসেছে।”


কবিতায়, সাহিত্যে, গানে—হেমন্তের নবান্ন বারবার ফিরে এসেছে। জীবনানন্দ দাশ কল্পনায় দেখেছেন ফিরে আসার দেশ হিসেবে ‘কার্তিকের নবান্নের দেশ’। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ফসলভরা ধরার প্রাচুর্যের গান।


আজ সময় বদলেছে, রীতিনীতিতে এসেছে পরিবর্তন। তবুও প্রকৃতি নিরন্তর সাজে হেমন্তের গৌরবে; আমনের সোনালি ফসল নবান্নের বার্তা নিয়েই দোলে মাঠে মাঠে। অনুষ্ঠানিক হোক বা না হোক—নবান্ন আজও উঠে আসে বাঙালির অতিথিপরায়ণতার টেবিলে, ভাতের থালায়, এবং কৃষ্টির গভীরে।


কারণ, মাছে-ভাতে বাঙালির কাছে এই ধানের মাঠই আমাদের প্রাচীনতম পরিচয় ও চিরায়ত কৃষ্টি।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad