অনিয়মের অভিযোগে তীব্র ক্ষোভ
শ্রীমঙ্গলের অবহেলায় নিভছে জঙ্গলবাড়ীর চা বাগানে শিশুদের শিক্ষার আলো
যেখানে প্রতিটি সকাল হওয়ার কথা ছিল অক্ষর শেখার আলোয় ভরে ওঠা এক নতুন সূচনা, সেখানে সেই সকালই যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে অব্যবস্থাপনা আর উদাসীনতার ভারে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার জঙ্গলবাড়ী চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখন শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমিত বিষয় নয়—এটি হয়ে উঠেছে চা-শ্রমিক পরিবারের কচি-কাঁচাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা–এর এই বিদ্যালয়ে প্রতিদিন আসে সেইসব শিশু, যাদের বাবা-মা সারাদিন বাগানে কঠোর পরিশ্রম করেন কেবল একটি ভালো ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই আশার কেন্দ্রে থাকা বিদ্যালয়েই নাকি নিয়মিত সময়মতো পাঠদান হচ্ছে না। শিক্ষকদের দেরিতে উপস্থিত হওয়া, নির্ধারিত সময়ের আগেই ক্লাস শেষ করে দেওয়া এবং পাঠদানে অনিয়ম—সব মিলিয়ে একটি অনিশ্চিত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টায় ক্লাস শুরুর কথা থাকলেও অনেক সময় শিক্ষকরা ১০টা ২০ মিনিটের পর বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। আবার দুপুরের আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়, ফলে শিশুদের জন্য নির্ধারিত শিক্ষার সময়ই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এতে করে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মৌলিক শিক্ষার ভিত গঠনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।
একজন অভিভাবক ক্ষোভ ও হতাশা মিশিয়ে বলেন, চা-শ্রমিকরা নিজেদের কষ্টের জীবনের ভেতর থেকেও সন্তানদের স্কুলে পাঠান, কিন্তু সেখানে যদি যথাযথ শিক্ষা না পাওয়া যায়, তাহলে সেই ত্যাগের মূল্য কোথায় দাঁড়ায়?
শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা বলে পাওয়া গেছে একই ধরনের অভিযোগ। কয়েকজন শিশু জানায়, শিক্ষকরা ক্লাস চলাকালীন সময়েও মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন, ফলে পড়াশোনার পরিবেশ অনেক সময় নষ্ট হয়। কেউ কেউ আরও জানায়, নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় তারা পাঠ্যবইয়ের অনেক অংশই ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না।
স্থানীয়দের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই বিদ্যালয়টি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি চা-বাগান এলাকার দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশুদের একমাত্র ভরসা। যেখানে তারা স্বপ্ন দেখতে শেখে, সেখানে যদি শিক্ষার আলোই ম্লান হয়ে যায়, তবে সেই স্বপ্নগুলো খুব সহজেই হারিয়ে যেতে পারে অন্ধকারে।
এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিষয়টি অবহেলা করার সুযোগ নেই, কারণ এটি সরাসরি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
শিক্ষা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি—কারণ প্রতিটি বিলম্বিত ক্লাস মানে একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা, আর প্রতিটি অবহেলা মানে একটি কচি স্বপ্নের নীরব মৃত্যু।
ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: