ঘাসে ঢাকা প্রাণ : সিলেটের ‘ফাইভ ইন ওয়ান’ মাঠ
ভোরের আলো ফুটতেই মোনালিসা হাঁটতে বের হন ভাবি তাহমিনা মিতুর সঙ্গে। দু’জনেই যেন ভোরের হাওয়া মেখে নিতে চান মনভরে। নগরীর উপশহরের জি ব্লক থেকে প্রতিদিন তাদের পদচিহ্ন মেলে আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সের সবুজ ঘাসে। ভোর ৫টা ৪৩ মিনিটে মাঠে ঢোকে আরও দু’জন নারী—একজন সাদা চুলের, বয়স ষাট পেরোনো; অপরজন তরুণী এনজিও কর্মী রোকশানা। তারা ইতিমধ্যেই এক দফা মাঠ ঘুরে এসেছেন। মাঠের অন্য প্রান্তে চলছে ক্যারাটের ছন্দ—হাতে ঘাম, মুখে মনোযোগ। বয়সে কিশোর থেকে তরুণ—সবাই সেখানে শৃঙ্খলার পাঠ নিচ্ছে। মাঝখানে ফুটবলের বল গড়িয়ে বেড়ায়, কোনে কোনে স্কুলপড়ুয়ারা ছোড়ে ক্রিকেট বল। এক মাঠে পাঁচ রঙের জীবন—তাই নাম যেন ঠিকই, ‘ফাইভ ইন ওয়ান’ মাঠ।
নগর সভ্যতার দমচাপা যান্ত্রিকতায় যখন একের পর এক মাঠ হারিয়ে যায় কংক্রিটের নিচে, তখন এই মাঠ যেন নগরের বুকের নিঃশ্বাস। এখানেই মানুষ খুঁজে পায় শৈশব, মুক্ত হাওয়া, সবুজে ছোঁয়া এক টুকরো শান্তি।
বিকেলে আবার জমে ওঠে জীবন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবুল হাসান আসেন স্ত্রী মাহমুদা চৌধুরীকে নিয়ে। বলেন—“এখানকার বাতাসেই ওষুধ আছে, এখানে আসলে শরীরও হাসে, মনও।” পাশে দাঁড়িয়ে মাহমুদা যোগ করেন, “একদিকে অনুশীলন, অন্যদিকে ফুটবল, ক্রিকেট, ক্যারাটে—সব মিলে যেন জীবনের উৎসব।”
দিনের দুই প্রহরে ভরে ওঠে এই মাঠ—ভোরের শিশিরে ও বিকেলের আলোয়। কেউ হাঁটে, কেউ দৌড়ায়, কেউ লড়ে নিজের ভেতরের ক্লান্তির সঙ্গে। নগরের শোরগোলের বাইরে এই মাঠে মানুষ খুঁজে পায় নিজেকে—যেন হারানো গ্রাম, খোলা হাওয়া, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম ডাকে সাড়া দেয় কোনো পুরোনো মন।
আধুনিকায়নের কোলাহলে মাঠেরা হারিয়ে গেলেও আবুল মাল ক্রীড়া কমপ্লেক্স এখনো দাঁড়িয়ে আছে সিলেটের মানুষের আশ্রয় হয়ে। এখানে আসে ক্লান্ত নগরবাসী, একটু নিঃশ্বাস নিতে, একটু বাঁচার স্বাদ পেতে।
এই মাঠ শুধু ঘাস আর মাটি নয়—এ যেন শহরের হৃদস্পন্দন, যা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—সবুজই জীবনের আসল রঙ।
নগর সভ্যতা ক্রমেই গিলে খাচ্ছে সবুজ প্রকৃতি, সবুজ মাঠ। এর প্রভাব পড়ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের উপর। আর খেলা বিমুখ প্রজন্মের আসক্তি বেড়ে গেছে মোবাইল ফোনে। এর ফলে সৃজনশীল চিন্তার বিপরীতে ভয়ানক কু-চিন্তার প্রভাব আগামী প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের পথে। এক সময় প্রতিটি গ্রামে গ্রামে ছিল বিশাল বড় খেলার মাঠ। স্কুল-কলেজ ছুটির পর সবাই দলবেধে মাঠমুখী ছিল। এখন গ্রামেও সেই অবস্থার যথেষ্ট অভাব। চিত্ত বিনোদন ও খেলাধুলার অভাব-শিক্ষার্থীদেরকে একেবারে ঘরমুখী করে তোলেছে। একই অবস্থা শহরেও। শহরে খেলাধুলার জন্য বিশাল মাঠ অনেকটা কল্পরাজ্যের মতো। মাঠ ভরাট করে স্থাপন হচ্ছে একের পর এক বসতি। যান্ত্রিক নগরে সেই অভাবের ষোলোকলা পূরণের স্থান আবুল মাল ক্রিড়া কমপ্লেক্স।
বিকাল বেলা শরীর চর্চা করতে আসা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবুল হাসান (৫৩) জানান, স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিদিন শরীর চর্চার জন্য এই মাঠে আসতে হয় নিয়ম করে। এখানকার স্বাস্থ্যকর পরিবেশ অনুশীলনবান্ধব। সাথে সায় জানিয়ে আবুল হাসানের স্ত্রী মাহমুদা চৌধুরী জানান, এখানে আসার বড় প্রাপ্তি হলো, একদিকে শরীর চর্চা, অন্যদিকে সাড়া মাঠ জুড়ে ক্রিকেট, ফুটবল,জিম ও ক্যারাতে প্রশিক্ষন উপভোগ করা।
দিনের দুইবেলা যেমন ভোর ও বিকাল বেলা নগরের যান্ত্রিক জীবনের জঞ্জাল থেকে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে প্রতিদিনই অনেক মানুষ জড়ো হন এই মাঠে।
মাঠে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে চার-পাঁচটি দল। কেউ ক্রিকেটে ব্যস্ত, কেউ ফুটবলে, কেউবা ক্যারাটে শেখায় মনোযোগী। এমনকি বেশ কিছু মধ্যবয়স্ক ও প্রবীণ নারী-পুরুষকে দেখা যায় শরীরচর্চায় নিমগ্ন। নাগরিক কোলাহলের বাইরে সব মানুষই নিজের ভেতরে যাপন কিংবা অনুভব করে একটি গ্রামীণ জীবন ; খোলা মাঠ, মৃদু হাওয়া, সবুজ বৃক্ষের ডালে আরক্ত কৃষ্ণচূড়ার জিকির ইত্যাদি।
এই মাঠটি যান্ত্রিক জীবনের জায়গার সংকটকালীন সময়ে বিশাল ভূমিকা রাখছে। সিলেট শহরে এমন মাঠ এখন খুবই অপ্রতুল। আধুনিকায়নের ছোঁয়ায় মাঠগুলো বিলীন হয়ে যাওয়ার পর থেকেই মানুষ অনুভব করছে খোলা জায়গার সেই অভাব। অভাবটুকু হয়ত ঘুচবে না পুরোপুরি তবু কিছুটা মিটিয়ে যাচ্ছে এই মাঠ। যেন নগরের মানুষের জন্য এই মাঠটি হয়ে উঠেছে সময় কাটানোর ও নির্ঝঞ্ঝাট থাকার এক আশ্রয়স্থল।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: